বিশেষ প্রতিনিধি
ভদ্রবেশে ভাড়াটিয়া সেজে বাড়িতে প্রবেশ করে তারা। কখনো ব্যাচেলর, আবার কখনো পরিবারসহ। যে বাড়িতে যে ধরনের ভাড়াটিয়া দরকার, ঠিক সেভাবেই ঘর ভাড়া নেওয়ার কথা বলে বাড়িতে প্রবেশ করে। এরপর সুযোগমতো ডাকাতি করে পালিয়ে যায়। ডাকাতির সময় বাধা দিলে খুনের ঘটনাও ঘটায় তারা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এমনই একটি চক্রকে গ্রেফতার করেছে, যারা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এলাকার একটি বাড়িতে ভাড়াটিয়া সেজে ডাকাতির পর এক বৃদ্ধাকে হত্যা করে পালিয়ে যায়। গতকাল মালিবাগে সিআইডির সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান অতিরিক্ত ডিআইজি ইমাম হোসেন।
সিআইডির এই কর্মকর্তা জানান, গত ৮ মে সোনারগাঁও থানার ঝাউচর এলাকার একটি বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরদিন বাড়ির মালিক আজিম উদ্দিন ও তার স্ত্রী হোসনে আরা বেগমকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। হোসনে আরা বেগম হাত-পা বাঁধা ও মুখে স্কচটেপ প্যাঁচানো অবস্থায় ছিলেন। তাদের হাসপাতালে নেওয়ার পর আজিম উদ্দিনের জ্ঞান ফিরলেও হোসনে আরা বেগমকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিত্সকেরা। এ ঘটনায় সোনারগাঁও থানায় আজিম উদ্দিনের ছেলে আল-আমিন বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করে সিআইডি। ডিআইজি ইমাম হোসেন বলেন, ঘটনার পর বৃদ্ধের এক ভাড়াটিয়া দম্পতিকে বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছিল না। তারা হলো হারুন অর রশীদ ও তার স্ত্রী সুলতানা খাতুন। তারা পালিয়ে প্রথমে রংপুরের মিঠাপুকুরে যায়। গত ১২ মে গাজীপুর থেকে তাদের গ্রেফতার করে সিআইডি। তারা আদালতে এই ডাকাতি ও হত্যার ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, জবানবন্দিতে হারুন ও সুলতানা স্বীকার করেছে, তারা একটি ডাকাত চক্রের হয়ে সোনারগাঁওয়ের ঐ বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল। এই চক্রের মূল হোতা শিপন ও সুমন, যারা বাড়িটি আগেই রেকি করেছিল। তারা নিজেরাই ঐ বাড়িতে ঘর ভাড়া নিতে চেয়েছিল, কিন্তু বাড়িওয়ালা আজিম উদ্দিন তাদের ভাড়া দেননি। এরপর এই দম্পতিকে নিয়ে আসে তারা। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের চার মাস আগে আজিম উদ্দিনের বাড়িতে ঘর ভাড়া নেয় হারুন ও তার স্ত্রী সুলতানা। বাড়ির মালিক আজিম উদ্দিনকে প্রায়ই চা খাওয়াত সুলতানা। তাদের কাছে বৃদ্ধ আজিম উদ্দিন যেতেন, তবে তার স্ত্রী হোসনে আরা বেগম কখনো যেতেন না, বরং তিনি তার স্বামীকে ভাড়াটিয়ার বাসায় যেতে নিষেধ করতেন বলেও জানান সিআইডি।
ডিআইজি ইমাম হোসেন জানান, গত ৭ মে রাতে বাড়ির মালিক আজিম উদ্দিনকে প্রথমে চায়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ায় সুলতানা। তবে তিনি অচেতন না হওয়ায় ঐ রাতে তারা ডাকাতি করতে পারেনি। পরদিন ৮ মে ফের চা খাওয়ায় তাকে। এরপর তিনি অচেতন হলে রাতে ডাকাত চক্রের মূল হোতা শিপন ও সুমন ঐ বাড়িতে আসে। তারা ঘরে ঢুকে বৃদ্ধার হাত-পা ও মুখ গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলে। এর পরও তিনি চিত্কার করার চেষ্টা করলে লাইট বন্ধ করে স্কচটেপ দিয়ে তার মুখ প্যাঁচিয়ে বাঁধা হয়। এরপর মালামাল নিয়ে চক্রের সদস্যরা পালিয়ে যায়। এ সময় ঘরের বাইরে হারুনের স্ত্রী পাহারায় ছিল। তিনি আরও জানান, মূল পরিকল্পনাকারী শিপন ও সুমন। টোপ হিসেবে হারুন ও তার স্ত্রী সুলতানাকে ব্যবহার করেছে তারা। শিপন ও সুমনকে ১৬ মে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে গ্রেফতার করে সিআইডি। তারা জানিয়েছে, হারুনকে ডাকাতির ১১ হাজার টাকা দিয়েছিল। কিছু নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। স্বর্ণালংকার বিক্রি করে দিয়েছে তারা। সেগুলো উদ্ধারে কাজ চলছে। তবে ঐ বাড়ি থেকে ডাকাতেরা কী পরিমাণ স্বর্ণালংকার নিয়েছে, তা নিহতের পরিবারের কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। হত্যাকাণ্ডে জড়িত চার জনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। ইমাম হোসেন বলেন, দ্রুত এ মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে।
