করোনার প্রভাব
স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া
করোনা মহামারিতে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়েছে। এ থেকে বাদ যায়নি গ্রামীণ ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো। এমনি একটি পণ্য গ্রামীণ তালপাখা। তালপাখার কদর সর্বজন বিদিত। বগুড়ায় তিন-চারটি গ্রামে এই তালপাখা তৈরি করা হয়। এই করোনাকালে তালপাখা বানিয়ে তা বিক্রি করতে না পেরে তারা বিপদে পড়েছেন। গত বছর করোনা শুরু হওয়ার পরেই থমকে গেছে বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী এ ব্যবসা। করোনায় গত দুই বৈশাখীসহ অন্যান্য মেলা বন্ধ হওয়া, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধিতে কারিগরদের লোকসানের সম্মুখীন হতে হয়। সর্বশেষ এবারের লকডাউনে তারা একেবারে হতাশ হয়ে পড়েছেন। গ্রামের কারিগর ও ব্যবসায়ীদের তথ্য মতে, শত বছরের পুরোনো জেলার কাহালু উপজেলার আড়োলা ও যোগীরভবন গ্রামে প্রায় ৭০টি পরিবার রয়েছে যারা এই তালপাখা বানায়। বছরে প্রতিটি পরিবার গড়ে এক থেকে দেড় লাখ টাকার তালপাতার পাখা বিক্রি করে। এতে গড়ে প্রতি বছর প্রায় কোটি টাকার পাখার ব্যবসায় হয় এ গ্রাম দুটিতে। কিন্তু করোনার কারণে এক বছরে তাদের বিক্রি অর্ধেক কমে গেছে।
গ্রীষ্মের শুরুতে ঐতিহ্যবাহী এই গ্রামে পাখা বিক্রির ধুম পড়ে যায়। কিন্তু করোনার কারণে বাইরের পাইকারি ব্যবসায়ীরা আসছে না। আবার লকডাউনের কারণে কারিগররা বাইরে এসব পাখা সরবরাহ করতে পারছে না। অনেকে সংসারের খরচ মিটাতে লোকসান দিয়ে পাখা বিক্রি করছে। তালপাতার পাখা তৈরির মৌসুম শুরু হয় অগ্রহায়ণে। চলে ভাদ্র মাস পর্যন্ত। কিন্তু গত বছরের করোনার ধাক্কায় অধিকাংশের মূলধন ছিল না। তারপরও চলতি মৌসুমে অর্থ লগ্নি করে তারা পৌষ মাস থেকে পাখা তৈরি শুরু করেন। তবে বিক্রির মূল সময় পহেলা বৈশাখেই তারা ব্যবসা করতে পারেনি। কারিগররা জানান, প্রথমদিকে কিছু পাখা তারা সরবরাহ করেছেন। লকডাউন দেওয়ায় গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মাল পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। আবার মহাজনরা মাল কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন। বর্তমানে মূলধন ফেরত পাওয়ার আশায় মহাজনদের কাছে মাল পাঠাতে হচ্ছে নিজ খরচে। সরেজমিনে আড়োলা ও যোগীরভবন গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এখানকার প্রায় সব বয়সের মানুষ পাখা তৈরির কাজ করেন। অধিকাংশ ঘরগুলোয় নারী পুরুষ একসঙ্গে বসে কাজ করছেন। কেউ পাতা কাটছেন, কেউ বাঁধছেন। অনেকে পাখায় রঙ করছেন। কিন্তু এর মধ্যেও কারিগরদের চোখেমুখে হতাশার ছাপ। অনাগত দিনের শঙ্কায় তারা দিনযাপন করছেন।
আড়োলা উত্তরপাড়ার কারিগর মজিবর রহমান আকন্দ (৮১) শুধু পাখা তৈরি করেই সংসার চালান। প্রতি বছর ৯ থেকে ১০ হাজার পিস ঘুরকি পাখা বানাতে পারেন তিনি। প্রতি পিস পাখা গড়ে ১০ টাকা দরে বিক্রি করতেন। এতে তার ১ লাখ টাকা আয় হয় প্রতি বছর। কিন্তু গেল বছর করোনায় ৭০ হাজার টাকার পাখা বিক্রি করেন। তাতে লাভের অর্ধেক অংশ হারাতে হয়েছে তাকে। মজিবর বলেন, ‘যত গরম হয়, পাখার চাহিদা তত বাড়ে। কিন্তু করোনা ও লকডাউনের কারণে এই তত্ত্ব কাজে লাগছে না। পাখার বাজার একেবারে পড়ে গেছে। এ বছর একশ পিস ঘুরকি পাখার বাজার দর ছিল ১ হাজার ১০০ টাকা। লকডাউন দেওয়ার পর দাম কমে গেল ২০০ টাকা। যাদের টাকা খুব দরকার তারাই বিক্রি করছেন।’ উত্তর পাড়ার বাদশা মিয়ার স্ত্রী হাফিজা বলেন, গত বছর করোনায় লোকসান হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এবার পৌষ মাসে পাখা বানানো শুরু করলাম। ৩ হাজার পিস পাতা কেনা হয়েছে। তবে দুই টাকার প্রতি পিস তালপাতা এবার কিনেছি ছয় টাকায়। কিন্তু পাখা বিক্রি করেছি মাত্র ৯০০টি। বগুড়ার ধুনট উপজেলার বাসিন্দা পাখার মহাজন মজিবরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। জানালেন গত বছর ৬০ হাজার টাকার পাখা কিনেছিলেন। এরপর ব্যবসা করতে পারেননি। লোকসান হয় ৩০ হাজার টাকা। এবার করোনা পরিস্থিতি ভালো দেখে পাখা কিনেছিলেন ১৭ হাজার টাকার। এতে লোকসান হয়েছে ৩ হাজার টাকা। এ জন্য পাখা কেনা বন্ধ করে দিছি। আড়োলা ও যোগীরভবন গ্রাম দুটি পাইকড় ইউনিয়নের অন্তর্গত। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিটু চৌধুরী বলেন আড়োলা ও যোগীরভবন গ্রামের প্রায় ৭০ ঘরে তালপাতার পাখা তৈরি হয়। করোনা দ্বিতীয় ঢেউয়ে লকডাউন দেওয়ার পর দুই গ্রামের পাখার কারিগররা একেবারে হতাশ হয়ে পড়েছেন। এর আগে ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় বিভিন্ন সহায়তা তাদের দেওয়া হয়েছে। আগামীতে সুযোগ আসলেই তাদের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
