স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার কক্ষ থেকে গোপন নথি চুরির অভিযোগ এনে প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে গতকাল সোমবার রাতে রাজধানীর শাহবাগ থানায় মামলা হয়েছে। এর আগে রোজিনাকে পাঁচ ঘণ্টা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরে শাহবাগ থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান গতকাল রাত ১২টায় ইত্তেফাককে বলেন, রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭৯ ও ৪১১ ধারায় চুরি এবং অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের (১৯২৩) ৩ ও ৫ ধারায় এই মামলা করা হয়েছে। আগামীকাল (আজ মঙ্গলবার) তাকে আদালতে হাজির করব।
সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ডা. শিব্বির আহমেদ ওসমানীর স্বাক্ষরিত দায়ের করা এজাহারে বলা হয়েছে, সাংবাদিক রোজিনা সোমবার বেলা ২টা ৫৫ মিনিটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের একান্ত সচিবের কক্ষে প্রবেশ করেন। এ সময় একান্ত সচিব কক্ষে উপস্থিত ছিলেন না। তখন রোজিনা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র শরীরের বিভিন্ন স্থানে লুকানো এবং মোবাইল ফোনে ছবি তোলেন। এ সময় সেখানে অবস্থান করা পুলিশ কনস্টেবল মিজানুর রহমান খান তাকে বাধা দেন। পরে সেখানে অতিরিক্ত সচিবসহ কর্মকর্তা ও স্টাফরা হাজির হন। তখন তার দেহ তল্লাশি করে অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেছা বেগম গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজ ও মোবাইল ফোনে ছবি উদ্ধার করেন। পরে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এজাহারে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ভ্যাকসিন ক্রয়সংক্রান্ত নেগোসিয়েশন চলমান রয়েছে। খসড়া সমঝোতা স্মারক ও নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট প্রণয়নের কাজ চলছে। এগুলো নিয়ে পত্র ও ইমেইলে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সেখানে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রচার হলে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই কাগজগুলো গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রয়োজনে জমা দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, (১৯২৩) এর ৩ ধারায় বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ স্থানে যদি কেউ যায় বা যেতে উদ্যত হয় কিংবা ঐ স্থানের কোনো নকশা বা স্কেচ তৈরি করে বা কোনো গোপন তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশ করে তবে সে অপরাধী হবে। ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান সংবলিত এই ধারায় অভিযোগ আনার জন্য অভিযুক্ত যে কোনো একটি বিশেষ কার্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থের পরিপন্থিমূলক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, তার প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। উক্ত বিশেষ কার্যটি তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও এই ধারায় তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে, যদি মামলার অবস্থা বা তার আচরণ বা তার জ্ঞান কার্যাবলি প্রমাণ করে যে, তার উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যাহত করা।
এর আগে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের একান্ত সচিব সাইফুল ইসলাম ভূঞার কক্ষে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা আটক রাখার পর গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ শাহবাগ থানায় উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, রোজিনা বেশ কিছুদিন ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশকিছু আলোচিত রিপোর্ট করেছেন, নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করেছেন। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এ সমস্ত রিপোর্টের কারণে তিনি আক্রোশের শিকার হয়েছেন।
এদিকে বেলা ৩টার দিকে সচিবালয়ে কর্মরত সাংবাদিকরা রোজিনা ইসলামকে আটকে রাখার খবর পেয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ছুটে যান। যে কক্ষে তাকে রাখা হয়েছিল, ছয় জন নারী পুলিশ সদস্যকে সেখানে দেখা যায়। কক্ষের বাইরে আরো কয়েক জন পুলিশ সদস্য ছিলেন। বেলা সাড়ে ৪টার দিকে রোজিনা ইসলাম উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘সচিবের সঙ্গে দেখা করতে আমি তার একান্ত সচিব সাইফুলের কক্ষে আসি। এরপর হঠাত্ করে পুলিশ ডেকে এনে আমাকে এই কক্ষে আটক করে।’ আটকের পর দেহ তল্লাশি করা হয়েছে জানিয়ে এ সাংবাদিক বলেন, ‘মিজান নামে এক পুলিশ সদস্য আমাকে নাজেহাল করেছে।’ এ দপ্তর থেকে কোনো ধরনের নথি নেননি বলে দাবি করেন রোজিনা।
গতকাল রাতে রোজিনাকে শাহবাগ থানার ওসির কক্ষে রাখা হয়। তবে সাংবাদিকদের সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এদিকে রোজিনাকে শাহবাগ থানায় নেওয়ার কিছুক্ষণ পর উপস্থিত সাংবাদিকরা বাইরে বসে বিক্ষোভ শুরু করেন। রাত ১০টার দিকে শাহবাগ থানার ওসির কক্ষ থেকে বেরিয়ে রোজিনার ছোট বোন সাবিনা পারভীন সুমী বলেন, ‘ও অসুস্থ। ওর শরীর ভালো না। গায়ে জ্বর। সকালে টিকা নিয়েছে। ওর শারীরিক অবস্থা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।’
