অণুগল্প

মায়ার ছলনায়

আপডেট : ১৮ মে ২০২১, ১৯:৫৬

 

রোদটা বেশ হেলে পড়েছে। কাঁধের গামছাটা দিয়ে ভালো করে কপালের ঘামটা মুছে নিল ফেলু মিয়া। জ্যৈষ্ঠ মাস অথচ আকাশে ছিটেফোঁটা মেঘও নেই।

—এই রিকশা যাবেন?

রিনরিনে কণ্ঠে কারো ডাক শুনে ফিরে তাকাল ফেলু মিয়া। দুটি মেয়ে, একজন সাদা অন্যজন নীল সালোয়ার কামিজ পরা।

—কই যাইবেন?

—নতুন বাজার। দূরদূরান্ত রেস্তোঁরা। কত নিবেন?

—পঁচিশটা টাকা দিয়েন।

—কিসের পঁচিশ টাকা। পনেরো টাকা দিয়ে রেগুলার যাই।

—না, যামু না।

মেয়ে দুটো এগিয়ে গেল। ফেলু মিয়ার শরীরটা ভালো না। বাড়িতে ছোট মেয়েটারও জ্বর। ওষুধ নিতে হবে, না হলে আজ আর বের হতো না সে। মেয়ে দুটো মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিকশা নেই। নীল জামা ব্যস্তভাবে ঘড়ি দেখছে। ফেলু মিয়া এগিয়ে গেল, উঠেন বিশ টাকা দিয়েন।

মেয়ে দুটো রিকশায় উঠে বসল। ফেলু মিয়া প্যান্ডেল মারতে শুরু করল। শরীরে আর আগের মতো জোর নেই। বয়স এখন পঞ্চাশ।

এই দীপা...আমার না কেমন যেন লাগছে। রিকশায় ডানপাশ থেকে একজন বলল, শোন, এত এক্সাইটেড হয়ে পড়িস না। আগে দ্যাখ ব্যাপারটা কী দাঁড়ায়। ভালো কথা, তুই তাকে চিনবি কী করে?

রাশেদ তো বলেছে নীল শার্ট পরে আসবে। আচ্ছা! এই জন্য তুইও নীল জামা পরেছিস? কী জানি করে ছেলেটা?

কতবার বলব তোকে, ব্যাংকে চাকরি করে।

থাকে তো গাজীপুরে তাই না? গ্রামের বাড়ি কই রে?

আশ্চর্য। গ্রামের বাড়ি কোথায়, আমি কী করে বলব?

বাব্বা! ছয় মাস মোবাইল ফোনে প্রেম করলি। কথা বলতে বলতে রাতের পর রাত পার করে দিলি, অথচ তার সম্পর্কে কিছুই জানিস না।

কিছুক্ষণ দুজনই চুপচাপ। ফেলু মিয়ার খুব ক্লান্ত লাগছিল। ছোট মেয়েটার জ্বর। দুশ্চিন্তাও হচ্ছিল।

—তুই কী ছেলেটার সঙ্গে পাকাপাকি রিলেশন করবি?

—করব, যদি সেরকম ছেলে হয়।

—আর আকাশের কী হবে?

—ধেত্! ওটা তো ছিল টাইম পাস।

রিকশা মাঝে মধ্যে জ্যামে পড়ছে, আবার চলছে।

—চাচা, বাঁয়ে একটু রাখেন।

ফেলু মিয়া থামল। সাদা জামা পরা মেয়েটা নেমে পড়ল, ‘যাই রে।’

—এই দীপা...শোন। তুই প্লিজ আমার সঙ্গে আয় না।

—মাথা খারাপ। আমার টিউশনি আছে না। তুই যা।

ফেলু মিয়া আবার চলতে শুরু করল। পেছনে খুব সুন্দর একটা রিংটোন বেজে উঠল। মেয়েটা ফের সময় নিয়ে ফোন ধরল। হ্যালো...আমি। আমি তো রাস্তায়...ঝরনাদের বাসায় যাচ্ছি...একটা নোট আনতে হবে।...আজ কী করে দেখা করব...আজ পারব না...খুব বিজি...না...না তো...কালকে মাস্ট দেখা করব...হ্যাঁ ঠিক আছে...আচ্ছা...রাখি...বাই।

রেস্তোরাঁ এসে গেছে। বেশ সাইড করে রিকশাটা দাঁড় করাল ফেলু মিয়া। ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে নীল জামা ঢুকে গেল ভেতরে। ফেলু মিয়ার বেশ খিদে পেয়েছে। ফুটপাতের ছোট চায়ের দোকানটায় ঢুকল সে। দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। ফেলু মিয়া সেই রেস্তোরাঁর সামনেই আছে। জ্বর-জ্বর লাগছে, মনমতো প্যাসেঞ্জারও পায়নি। রেস্তোরাঁর কাচের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এক নীল জামার সঙ্গে নীল শার্ট পরা একটা ছেলে, ছেলেটা মেয়েটাকে একটা রিকশা করে দিল। মেয়েটা চলেও গেল। নীল শার্ট এদিক-ওদিক তাকাল। একটা সিগারেট ধরাল। কতক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল। তারপর এগিয়ে এলো ফেলু মিয়ার দিকে, ‘এই বাসস্ট্যান্ড কত?’

—তিরিশ টাকা।

ছেলেটা দ্বিরুক্তি না করে উঠে বসল। ছেলেটার ফোন এসেছে। হ্যালো...আমিও...কই তুই?...হু...দেখা হয়েছে...আরে না...মোটামুটি...নীরার সামনে দাঁড়াতেই পারবে না। না...না...আর ধেত্ প্রশ্নই আসে না...আমি আজই আসছি...এই অমিত...তুই যেমন লোক, মিতু ফোন দিচ্ছে...আচ্ছা...হ্যাঁ...রাখি।

হ্যাঁ...মিতু...কেমন আছ তুমি?...আমি তো অফিস থেকে বের হলাম...বাসায় যাচ্ছি...তোমার জন্য।

ফেলু মিয়া কেমন হাঁপিয়ে গেছে। জ্বরটা বোধহয় বেড়েছে। ধীর পায়ে সে প্যান্ডেল মারতে থাকে। রাস্তার দৈর্ঘ্য কি বেড়ে যাচ্ছে?