প্রায়শই একটি কথা শুনা যায়—আইনের শাসন মানিয়া চলিতে হইবে। নিশ্চয়ই। আইন ব্যতীত বিশ্ব অন্ধ। এই বিশ্বপ্রকৃতিও চলিতেছে আইন মানিয়া। উহা পদার্থবিজ্ঞানের আইন। মানবসভ্যতাও চলিতেছে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে। কিন্তু সত্যিই কি বিশ্বের সকল দেশে আইনের সুষ্ঠু ও সঠিক প্রয়োগ হয়?
বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশভেদে আইনের শাসনের বিভিন্ন প্রকারভেদ লক্ষ করা যায়। বিশেষ করিয়া এই উপমহাদেশে এবং আফ্রিকার গরিব দেশগুলিতে আইনের শাসন অনেক ক্ষেত্রেই প্রহসনে পরিণত হয়। আইনের দেশ ইংল্যান্ডে যেই সকল সাধারণ নীতি দ্বারা আইনের শাসন নিশ্চিত হইয়াছে তাহার অধিকাংশই সেইখানকার নাগরিকদের আদালতে উত্থাপিত বিভিন্ন মামলার বিচার বিভাগীয় রায়ের ফসল। ঐ সকল রায়ে নাগরিকদের ব্যক্তিগত অধিকার নির্ধারিত হইয়াছে। ষোড়শ শতকে ইংল্যান্ডের রাজা জেমস বলিয়াছিলেন, বিচারকেরা তাহার সহিত সলাপরামর্শ না করিয়া কোনো রায় ঘোষণা করিবেন না। এই ব্যাপারে রাজা জেমস ১২ জন বিচারকের মনোভাব জানিতে চাহিলে এক জন বাদে সকল বিচারকই ‘জি হুজুর, জি হুজুর’ করিয়াছিলেন। কিন্তু বিচারক স্যার এডওয়ার্ড কোক ভিন্নমত পোষণ করেন। রাজা তাহাকে অপসারণ করিলেন বটে কিন্তু ইহার ভিতর দিয়াই স্যার এডওয়ার্ড চিরস্মরণীয় হইয়া রহিলেন। একই সঙ্গে ভিন্ন ভাবনাও রহিল যে, আইনের শাসনের মানে হইল ক্ষমতাসীনের হাত হইতে বিচারকে প্রভাবিত করিবার ক্ষমতা রহিত করা।
দুঃখজনকভাবে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশই এখনো আধাসামন্তবাদের মানসিকতা হইতে মুক্ত হইতে পারে নাই। এই কারণে এইখানে আইনের শাসন বলিতে বুঝায়—ঝোপ বুঝিয়া কোপ মারা। এইখানে গাল ফুলাইয়া বড় গলায় বলা হয়—কেহ আইনের ঊর্ধ্বে নহে। বিদ্বজ্জনেরা মনে করেন, এই কথা বলিয়া আসলে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেওয়া হয়। তবে বড় বড় পদের মানুষ সাধারণ মানুষকে যতখানি বোকা মনে করেন, তাহারা কিন্তু ততটা বোকা নহেন। সমস্যা হইল, তৃতীয় বিশ্বের মানুষ মিথ্যার এক মহাসমুদ্রে বসবাস করিয়া থাকে। সেইখানে কেহ যদি প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করিতে চাহেন এবং তিনি যদি রাজনীতিক হন, তাহা হইলে তাহাকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করিবার পরিবর্তে খুঁজিয়া দেখা হয় তাহার কী কী ব্যবসা আছে, কোথায় কোথায় তথাকথিত ‘সমস্যা’ আছে। এইভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আইনের আওতায় আনা হয়। গাল ফুলাইয়া বলা হয়—কেহ আইনের ঊর্ধ্বে নহে। অথচ যেই অপরাধের জন্য তাহাকে আইনের শাসানি দেওয়া হইল, দেখা যাইবে সেই অপরাধ শতসহস্র মানুষ করিয়াছে কিংবা করিতেছে। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে আইন যেন চক্ষু মুদিয়া রহিয়াছে। অথচ সত্যিকারের আইনের প্রয়োগ হইলে সকলের ক্ষেত্রেই তাহা সমানভাবে হওয়া উচিত। এখন প্রভাবশালীদের লেজে পা পড়িলেই তাহারা আইনের শাসনের কথা বলিয়া রক্তচক্ষু দেখাইবেন, গলার রগ ফুলাইবেন—ইহাকে কি আইনের শাসন বলা যায়? এই ব্যাপারে স্বনামধন্য ফরাসি পণ্ডিত মন্টেস্কু তাহার ‘দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ’ গ্রন্থে আমাদের অন্য অভিজ্ঞতার কথা বলিয়াছেন। তিনি স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন—‘অভিজ্ঞতা আমাদের অনবরত দেখাইতেছে যে প্রত্যেক ব্যক্তি, যাহার হাতে ক্ষমতা রহিয়াছে, তিনি তাহা সুকৌশলে অপব্যবহার করিয়া চলেন এবং তাহাকে রুখিয়া না দেওয়া পর্যন্ত তিনি তাহার কর্তৃত্বপরায়ণতা বজায় রাখিয়া চলেন।’ এই কারণে উন্নত বিশ্বে রাষ্ট্রের ক্ষমতা আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ করা হয়, যাহাতে কাহারো ক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহার না হয়। এই ব্যাপারে জ্ঞানীগুণীরা বলিয়া থাকেন—একটি গণতান্ত্রিক দেশের ‘আইনের শাসন’ও সেই দেশটির নাগরিকরা কী চাহে তাহার প্রতিফলন, কারণ জনগণের ভোটের মাধ্যমেই শাসক নির্বাচনের অধিকার এবং ক্ষমতা রহিয়াছে। কিন্তু সেই শাসক নির্বাচনেও যদি ইঞ্জিয়ারিং ঘটে, তখন কী হইবে?
আইনের শাসনের অভাব থাকিলে কী হইতে পারে—তাহার জলজ্যান্ত উদাহরণ বর্তমানে আইনের স্বর্গোদ্যানখ্যাত জার্মানিতেই একসময় দেখা গিয়াছিল। নািস আমলে বিচারের নামে যেই প্রহসন চলিত আদালতকক্ষে, তাহা আজও সিনেমা বা পুরাতন তথ্যচিত্রে যে কেহ দেখিলে তাহার শরীর দিয়া শীতল রক্তস্রোত বহিয়া যাইবে। বিচারকরা নিরপরাধ আসামিদের উপর হম্বিতম্বি করিয়া তাহাদের কথা বলিতে দিতেন না। রায় ছিল পূর্বনির্ধারিত। দূর ভবিষ্যতে তৃতীয় বিশ্ব যদি আর তৃতীয় না থাকে—তখন বর্তমান সময়ের ‘আইনের শাসন’ দেখিয়া ভবিষ্যত্ মানুষদের শরীর দিয়া কি শীতল রক্তস্রোত বহিয়া যাইবে না?
