অটিজমের আবিষ্কার

আপডেট : ১৮ মে ২০২১, ২১:৪৪

আবিষ্কার এবং আবিষ্কার সম্বন্ধে জানায় ভালো লাগার মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে। থাকবেই বা না কেন? আবিষ্কার অজানাকে জানায়। অটিজম তেমনি একটি অজানা বিষয়। এক ধরনের স্নায়ুগত বৈকল্যের নাম অটিজম। দুই থেকে তিন বছরের শিশুর মধ্যে এই বৈকল্যের উপসর্গগুলো দেখা যায়।

আবিষ্কারপূর্ব সময় পর্যন্ত অটিজম ছিল মানুষের কাছে অজানা। কিন্তু পূর্বেও অটিজম আমাদের মধ্যে ছিল। ড. লিও ক্যানার নামে এক শিশু-মনোচিকিত্সক অটিজম নির্ণয়ের এই মহত্ কাজটি করেন। ড. লিও ক্যানারের চিকিত্সাবিষয়ক অধ্যয়ন জন্মভূমিতে শুরু হলেও তার পেশা শুরু হয় অভিবাসী দেশ আমেরিকায়। ড. ক্যানার মূলত অস্ট্রীয়। তিনি হাঙ্গেরির ঐতিহাসিক অঞ্চল গ্যালিছিয়ার একটি ছোট্ট শহরে ১৮৯৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯০৬ সালে চলে যান বার্লিনে এবং সেখানেই চিকিত্সাবিদ্যা অধ্যয়ন শেষ করেন। তিনি ১৯২১ সালে অভিবাসী হয়ে আসেন আমেরিকায় এবং দক্ষিণ ডাকোটার একটি হাসপাতালে কাজ শুরু করেন। তিনি ১৯৩০ সালে জন হপকিন্স মেডিক্যাল স্কুলে যোগ দেন। একই সালে তাকে হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে শিশু-মনোরোগ সেবাদানব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনিই প্রথম, যিনি এই হাসপাতালে একজন শিশু-মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একাডেমিক শিশু-মনোরোগ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৫ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় তার ‘চাইল্ড সাইকিয়াট্রি’ শিরোনামের প্রথম বই।

১৯৩৮ সালের কথা। ডোনাল্ড গ্রে ট্রিপলেট নামের এক শিশুর বাবা ক্যানারের কাছে ছেলের আচরণসহ কিছু তথ্য জানিয়ে লিখিত এক রিপোর্ট পাঠান। আসলে এই শিশুই বিশ্বে অটিজম শনাক্ত প্রথম শিশু। ড. ক্যানার ডোনাল্ডের বাবার রিপোর্ট থেকে তিনি জানতে পারেন, সে একা থাকতে ভালোবাসে এবং তখনই সে বেশি খুশি থাকে। তাকে দেখে মনে হয় সে একটি খোলসে রয়েছে এবং নিজের মধ্যেই বাস করছে। নিজের চারপাশ সম্বন্ধেও অনবহিত। তার মধ্যে ঘূর্ণনজাতীয় বস্তুর প্রতিও বাতিক রয়েছে বলে জানতে পারেন। আর তার রুটিনের ব্যতিক্রম ঘটলে সে মেজাজ দেখায়। ড. ক্যানারের কাছে ডোনাল্ড এসেছিল পাঁচ বছরের কিছু বেশি বয়েসে। এ বিষয়ে ড. ক্যানারের মন্তব্য চমকপ্রদ। তিনি মনে করেন, ‘ডোনাল্ড অন্য পাঁচ বছর বয়েসের ছেলের মতো নয়।’ অটিজম নির্ণয়ে তার গবেষণায় ডোনাল্ড বাদেও আরো সাতটি ছেলেশিশু এবং তিনটি মেয়েশিশু ছিল। ছেলেগুলোর নাম ছিল যথাক্রমে ফ্রেডরিক, রির্চাড, পল, হার্বাট, আলফ্রেড, চার্লস ও জন। আর মেয়ে তিনটির নাম ছিল যথাক্রমে ভার্জিনিয়া, বারবারা ও ইলেইন। এই ১১টি শিশুর ওপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল ‘অটিস্টিক ডিস্টার্বেন্স অব এফেক্টিভ কন্টাক্ট’ একটি গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়। গবেষণা কেসস্টাডিতে তিনি দেখতে পান, এসব শিশুর মধ্যে সহজাত বিশৃঙ্খলা রয়েছে। তার মতে, এই শিশুরা স্বাভাবিক শিশুদের চেয়ে কিছুটা আলাদা। তার বিশ্বাস থেকে তিনি বলেন, সামাজিক জগত্ সম্বন্ধে এদের অস্বাভাবিকতা সহজাত প্রকৃতির এবং এই সমস্যা নিয়েই তারা জন্মগ্রহণ করে। এসব শিশু একই বিষয়ে স্থির থাকতে চায় এবং একই বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকতেই অভ্যস্ত।

সার্বিক গবেষণায় ড. ক্যানার বলেন, গবেষিত এসব শিশুর প্রত্যেকের মধ্যেই ‘প্রত্যাহার বা প্রত্যাখ্যানের’ মনোভাব রয়েছে। এজন্য তিনি অটিজমের কথা চিন্তা করেন। কিন্তু তিনি সরাসরি ‘অটিজম’ শব্দটি ব্যবহার করেন না। সাধারণত শিশুর জন্মের তিন বছরের মধ্যে অটিজমে উপসর্গ ও অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। তাই তিনি একে নাম দিয়েছিলেন ‘ইনফেন্টাইল অটিজম’ বা ‘প্রারম্ভিক শিশুসুলভ অটিজম’। তবে পরের দিকে এসব শিশুর ব্যাপারে বর্ণিত আচরণ সমন্ধে কিছু আলাদা মন্তব্যও দেখা যায়।

উল্লেখ্য, ‘অটিজম’ ইংরেজি কোনো শব্দ নয়। শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘অটোস’ থেকে। ‘অটোস’ শব্দটির অর্থ ‘সেলফ’ বা নিজ’। ইংরেজিতে ‘অটিস্টিক’ শব্দটিও গ্রিক শব্দ। এই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় ১৯৪৩ সালে। আর তখনই জানা হয় অটিজমের কথা। প্রকৃতপক্ষে অটিজম বিষয়ে জানার ক্ষেত্রে ড. ক্যানারের গবেষিত ১১টি শিশুর কেসস্টাডির প্রাপ্ত তথ্য অটিজম সম্বন্ধে জানার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এই গবেষণা একটি দালিলিক সাক্ষীর মতো। এ বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও তিনিই অগ্রগামী। তাই ড. ক্যানারের নামের সঙ্গে অটিজমের নাম বিশেষভাবে জড়িত। ড. ক্যানার তার জীবনভর অটিজম এবং অন্যান্য শ্রেণির প্রতিবন্ধীদের অবমানতার বিরুদ্ধে কাজ করে গেছেন। তিনি এদের পরিবারের প্রতিও গভীরভাবে সহানুভূতিশীল ছিলেন।

n লেখক : সাবেক অধ্যাপক, নটর ডেম কলেজ; বর্তমানে টরন্টো স্কুল বোর্ডে কর্মরত