পানির উত্স নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রস্তাবিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরী পানি সরবরাহ’ প্রকল্পটি ঝুলে রয়েছে। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড ও মিরসরাই এলাকায় শিল্পকারখানায় পানি সরবরাহের জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রকল্পটি গ্রহণ করে। প্রকল্পের পানির উত্স নির্ধারণ করা হয়েছিল হালদা নদী। এতেই আপত্তি জানান পরিবেশবাদীরা। আপত্তির কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী ৬ জুন প্রকল্পের পানির উত্স নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মিটিং ডাকা হয়েছে। মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হবে প্রকল্পটি চট্টগ্রামের মোহরায় নাকি চাঁদপুরে নির্মাণ করা হবে। চট্টগ্রামে শিল্পায়নের সম্ভাবনাময় সীতাকুন্ড ও মিরসরাই এলাকা পানি সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম ইত্তেফাককে বলেন, প্রকল্পের পানি উত্তোলন নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী ৬ জুন পরিকল্পনা কমিশন মিটিং ডেকেছে। মিটিংয়ে হালদা ও প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ডাকা হয়েছে। সেখানে প্রকল্পের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। আমরা হালদা ছাড়াও বিকল্প হিসেবে মেঘনা নদী থেকে পানি উত্তোলনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই করেছি। পানির উত্স হালদা হলে মোহরায় ও মেঘনা নদী পানির উত্স হলে চাঁদপুরে প্রকল্পটি নির্মিত হবে। সীতাকুন্ড ও মিরসরাই এলাকায় চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের উভয় পাশে রপ্তানিমুখী অনেক শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মহাসড়কের পাশের এই এলাকা প্রাধান্য দিচ্ছে। নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য বিনিয়োগকারীরা জায়গা কিনে রেখেছে। মিরসরাই এলাকায় দেশের সর্ববৃহত্ শিল্পনগরী হচ্ছে। তবে এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও গ্যাস সংকট রয়েছে। সংকট নিরসনে কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি ও চট্টগ্রাম ওয়াসা সরকারের উচ্চ মহলের নির্দেশে পৃথক প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরীতে পানি সরবরাহের জন্য তাদের মাস্টার প্ল্যানে একাধিক উত্স নির্ধারণ করেছে। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) সম্ভাব্যতা যাচাই করে পানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়নের মতামত দিয়েছে। তার আলোকে চট্টগ্রাম ওয়াসা ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ প্রকল্পের ডিপিপি তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
ওয়াসার প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরীতে ২০৪০ সালনাগাদ দৈনিক ৯১ কোটি লিটার পানির প্রয়োজন হবে। তারা ভূগর্ভস্থ, বৃষ্টির পানি, ফেনী ও মহুরী নদী থেকে পানির সংগ্রহের উত্স মাস্টার প্ল্যানে উল্লেখ করেছে। তবে চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রকল্পটি মোহরা এলাকায় নির্মাণের ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এখানে বর্তমানে ১৯৭৮ সালে নির্মিত ওয়াসার একটি পানি শোধনাগার রয়েছে। সেটি থেকে দৈনিক ৯ কোটি লিটার চট্টগ্রাম মহানগরীতে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। তার পাশে দ্বিতীয় পানি শোধনাগারটি নির্মাণ করা হবে।
এদিকে প্রকল্পটি নিয়ে কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠনের অভিযোগ হালদা নদী থেকে বর্তমানে ওয়াসা দুটি পানি শোধনাগার প্রকল্পের জন্য দৈনিক ১৮ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করছে। ফলে আরো ১৪ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করা হলে হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য, ডলফিন হুমকির সম্মুখীন হবে। জানতে চাইলে হালদা রিভার রিচার্জ ল্যাবরেটরি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া ইত্তেফাককে বলেন, হালদা দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজনন কেন্দ্র। হালদা থেকে পানি উত্তোলন নিয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও মত্স্য মন্ত্রণালয়সহ আরো কয়েকটি সংস্থা আপত্তি করেছে। আমরাও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে চিঠির মাধ্যমে সমস্যা তুলে ধরেছি। ওয়াসা অন্য উত্স থেকে পানি উত্তোলন করতে পারে। তবে হালদা থেকে আরো পানি উত্তোলন করা হলে প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজনন কেন্দ্রের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
