দর্শকদের কাঁদিয়ে সফল ‘সিকিউরিটি গার্ড’

আপডেট : ১৯ মে ২০২১, ১০:২২

যেকোনো পরিবারে বড় ভাই ও ছোট ভাইয়ের সম্পর্কটা হয় অন্যরকম। একজন অন্যের জন্য জানপ্রাণ থাকে, কিন্তু কখনো সেভাবে বলা হয় না। যে পরিবারে বাবা নেই, সেখানে বড় ভাই বাবার ছায়া দেন ছোট ভাইকে। নিজে না খেয়ে ছোট ভাইকে খাওয়ান। ছোট ভাইয়ের কথা ভেবে সংসার করার স্বপ্নকে ডানা মেলতে দেন না। ‘সিকিউরিটি গার্ড’ নাটকে দুই ভাইয়ের এমন একটি ভালোবাসার গল্প দর্শকদের আবেগ ছুঁয়ে গেছে। ভ্রাতৃপ্রেমের দারুণ একটি দৃষ্টান্ত বলা যায় এটি। ফলে ভাই ভাই বন্ধনকে আরও সৃদৃঢ় করে তুলতে পারে এই নাটক।

‘সিকিউরিটি গার্ড’ দেখে দর্শকরা চোখে জল ধরে রাখতে পারেননি। তাই তারা এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কান্নার রঙে যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে এই গল্প। নাটকটি লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন এমএনইউ রাজু। তিনি নির্মাতা মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের সহকারী। রাজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিনেমাওয়ালার ঈদ আয়োজন ‘ফ্যামিলি এক্সপ্রেস’ সিরিজের একটি নাটক এটি। এর ভাবনা রাজের। অ্যাডভাইজরি পরিচালকের দায়িত্ব সামলেছেন তিনিই।

ইউটিউবে এখন বাংলাদেশ ট্রেন্ডিংয়ে ১৬ নম্বরে আছে ‘সিকিউরিটি গার্ড’। নিম্ন-মধ্যবিত্ত একটি শ্রেণিপেশার মানুষের গল্পের ভেতর বেশ কয়েকটি বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। কোনো কাজই যে ছোট নয়, সেটাই মূল বক্তব্য বলে মনে হয়। নাটকটির সংলাপ সেটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তাই নাটকপ্রেমীদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন আলাদাভাবে উল্লেখ করছেন কয়েকটি সংলাপ। সেগুলোতেই মিশে আছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার মতো বক্তব্য। একটি সংলাপ আলাদা করে বলাই যায়— ‘কখনো কোনো মানুষকে তার অবস্থান দেখে ভালোবাসতে হয় না। অবস্থান দেখে যে মানুষটা চলে যায়, সে আর যাই হোক আমার লাইফ পার্টনার হতে পারে না।’

গত ১৩ মে ইউটিউবে সিনেমাওয়ালা চ্যানেলে প্রকাশ হয়েছে নাটকটি। এতে লাইক পড়েছে ৩৮ হাজারের বেশি। এর গল্প রাজু ও রকির বন্ধনকে ঘিরে। রাজু একটি অফিসের সিকিউরিটি গার্ড। একদিন সে জ্বরে কাবু হয়ে পড়লে তার প্রক্সি দেয় রকি। রকির প্রেমিকা মাইশার এক বন্ধু দারোয়ানের পোশাকে তাকে দেখে মোবাইল ফোনে ছবি তুলে রাখে। এমন অবস্থায় দেখে রকির সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে মাইশা। রাজু যে অফিসের সিকিউরিটি গার্ড, একদিন সেখানেই বড় পদে চাকরি পেয়ে যায় রকি। পরের ঘটনাটা বোঝাতে একটি সংলাপ বলা যায়, ‘ওইদিনের সেই সিকিউরিটি গার্ড ছেলেটা আজ তোমার বাবার বস।’ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পেশার মানুষদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা হলেও বদলে দিতে পারে এই নাটক।

রাজু চরিত্রে সাজু খাদেম অনবদ্য। সাধারণত হাস্যরসধর্মী চরিত্রেই দর্শকরা তাকে বেশি দেখেছেন। কিন্তু ‘সিকিউরিটি গার্ড’ তাকে নিয়ে নির্মাতাদের মধ্যে ব্যতিক্রম ভাবনা এনে দিতে পারে। অফিসের দারোয়ান ও বড় ভাইয়ের চরিত্র দুটি একসঙ্গে উপস্থাপনে তার মুন্সিয়ানা মনে রাখার মতো। রকি চরিত্রে মুশফিক আর. ফারহান দারুণ। রসিক, রাশভারী, বড় ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধাভাজন ও গুনমুগ্ধ— তার চরিত্রেও আছে এমন বৈচিত্র্য। কেয়া পায়েল বেশ সাবলীল।

গল্পটিকে অন্যমাত্রা এনে দিয়ে ‘ভাই আমার দুনিয়া’ শিরোনামের একটি গান। পরিচালক এমএনইউ রাজুই এটি গেয়েছেন। জনি হকের লেখা গানটির সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন নাভেদ পারভেজ। একটি হৃদয়ছোঁয়া সুর সৃষ্টি করেছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাটকটি নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে অনেকে গানটির কথা টেনে এনেছেন।

ফেসবুকে বাংলা নাটক গ্রুপে আক্তার হোসেন গানটির প্রথম তিন লাইন দিয়েছেন নিজের পোস্টে, ‘ভাই বড় ধন/রক্তের বাঁধন/বাবার অভাব করলে পূরণ’। তার মতে, ‘ভাইয়ের মতো সেরা বন্ধু আর কেউ হতে পারে না। একজন বড় ভাই-ই বাবার অভাব পূরণ করতে পারে। নাটকটি সুন্দর ও হৃদয়স্পর্শী। সাজু খাদেম ও মুশফিক আর. ফারহানের অভিনয় দারুণ হয়েছে।’

পোস্টটিতে আহামেদ লালন মন্তব্য করেছেন, প্রশংসনীয় একটি কাজ। সোহেল রানা মনে করেন, নাটকটি থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। তার চোখে, ‘খুব সুন্দর একটি নাটক।’ আকাশ রায় বলেন, ‘অনেক ভালো লেগেছে নাটকটি। চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।’ আশীষ তালুকদার জানিয়েছেন, নাটকটি খুব ভালো। একই পোস্টে মান্না ভাই নামের একটি আইডি থেকে বলা হয়েছে, ‘মুশফিক আর. ফারহানের এই প্রথম কোনো কাজ এতো ভালো লাগলো।’

মো. মোশারফ হোসেন পোস্ট দিয়েছেন, ‘দুই ভাইয়ের গল্প নিয়ে নাটকটি অসাধারণ লেগেছে। কখনো হেসেছি, আবার মনও খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে গানটি বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।  অভিনয় নিয়ে যদি বলি— সাজু খাদেমে আমি মুগ্ধ। কী অসাধারণ অভিনয়! তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে অনেক ভালো কিছু দিতে পারেন।’

একই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে সিরাজুল ইসলাম রাসেল বলেন, ‘আমারও চরম ভালো লাগলো।’ আহামেদ বায়জিদের কথায়, ‘কী বলবো, নাটকটা দেখে ভাষা হারিয়ে ফেলেছি! ভাইয়ের জন্য ভাইয়ের এত ভালোবাসার ব্যাপারটা হয়তো এই নাটক না দেখলে বুঝতে পারতাম না। ঈদে যত নাটক দেখেছি, সবচেয়ে সেরা কাজ এটি।’ নাজমুল আহমেদ নেহালের প্রশ্ন, নাটকটি দেখে কেউ কি চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন? আমি পারিনি।’

মুহাম্মদ জুয়েল পোস্ট দিয়েছেন, ‘অসাধারণ একটা গল্প! বড় ভাই কী, যার নেই সে-ই বোঝে। নিঃসন্দেহে ঈদের সেরা নাটকগুলোর মধ্যে এটি একটি।’

মারুফ রাসেলের পোস্ট এমন, ‘বর্তমান বাস্তবতায় নাটকটি বেশ প্রয়োজনীয় সবার জন্য। সিকিউরিটি গার্ডের ভূমিকায় সাজু খাদেম দারুণ অভিনয় করেছেন। নাটকটি তার অন্যতম সেরা কাজ হয়ে থাকবে। বড় ভাইয়ের দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করেছেন। চমৎকার অভিনয় করেছেন মুশফিক আর. ফারহান। কেয়া পায়েলের অভিনয়ও ভালো লেগেছে। নাটকের কিছু দৃশ্য দেখে আপনা-আপনি অশ্রুসিক্ত হয়ে যায় চোখ। সংলাপ ও পরিচালনা ভালো লেগেছে।’

কামরুল হাসান নিজের পোস্টে ‘সিকিউরিটি গার্ড’কে রেটিং দিয়েছেন ৮.৫/১০। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া মুশফিক আর. ফারহানের আট-দশটা নাটকের মধ্যে তার কাছে সেরা মনে হয়েছে এটি। তিনি লিখেছেন, ‘একটি চমৎকার গল্প, সাবলীল অভিনয়— সব মিলিয়ে দারুণ। আরেকটি কথা না বললেই নয়, নাটকটিতে সাজু খাদেমের অভিনয় দেখার মতো। বড় ভাইয়ের চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন তিনি।’ পোস্টটির মন্তব্যে হাফসা আক্তার সানহা বলেন, ‘দেখার মতো একটি নাটক।’ জেরিন ইসলামের মতে, ‘দুই ভাইয়ের মধুর সম্পর্কে ভরা একটি নাটক।’ মেহেরিন জুঁই বলেছেন, ‘শেষ দৃশ্যে চোখে পানি চলে আসে।’ বুলবুল আহমেদের বর্ণনায়, ‘অসাধারণ একটা কাজ।’

মো. শাহিন পোস্ট দিয়েছেন, ‘দারুণ ভালো লাগলো নাটকটি। ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের কর্তব্য ও ভালোবাসার এক অন্যরকম দৃষ্টান্ত। মুশফিকুর আর. ফারহান সবসময়ই সেরা। তবে সাজু খাদেমের অভিনয়টা মনে দাগ কেটেছে। এরকম একটি নাটক উপহার দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।’ তার পোস্টের মন্তব্যে সোহেল রানা লিখেছেন, ‘ভালো লাগার মতো একটি নাটক। শিক্ষণীয় অনেক কিছুই রয়েছে এতে।’ মো. তানবের খানের মতে, ‘সাজু খাদেম অসাধারণ।’ কামরুল হাসান মনে করেন, এবারের ঈদে মুশফিক আর. ফারহানের সেরা কাজ এটি। মো. মশিউর রহমানের কথায়, ‘আমার দেখা অন্যতম সেরা নাটক।’

বুলবুল আহমেদ পোস্ট করেছেন, ‘হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো একটি নাটক। মুশফিক আর. ফারহান ও সাজু খাদেম ফাটিয়ে দিয়েছেন! ফারহানের ভক্ত হয়ে গেলাম। আর এমএনইউ রাজু অভিনয়ের পাশাপাশি এবার পরিচালনায় ফাটিয়ে দিয়েছেন। যোগ্য গুরুর যোগ্য শিষ্য। ঈদের সেরা কাজের মধ্যে একটি সিকিউরিটি গার্ড।’

সুন্দর একটি নাটক উপহার দেওয়ার জন্য মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের সিনেমাওয়ালা বাহিনীকে ভালোবাসা জানিয়েছেন সাধারণ দর্শকরা। বিশেষ করে সিকিউরিটি গার্ড-এর অন্যতম একটি ভালো দিক তারা মনে করছেন ইংরেজি সাবটাইটেল। তাদের মন্তব্য, এর ফলে বিভিন্ন দেশের মানুষ নাটকটি উপভোগ করতে পারছেন। তারা মনে করেন, বাংলা নাটকে ইংরেজি সাবটাইটেল দেওয়া প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ভিন্ন ভাষাভাষির দর্শকরা বাংলাদেশের তরুণদের নির্মাণশৈলী উপভোগের সুযোগ পাবেন। এতে পরিচিতি বাড়বে বাংলাদেশি নাটকের।

ইত্তেফাক/বিএএফ