একের আনন্দে সবার আনন্দ

আপডেট : ১৯ মে ২০২১, ২১:৩৭

প্রায় ১২৪ বছর আগে, অমিত আক্ষেপে, সমাজকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘আমরা বহুশত বত্সর পাশে পাশে থাকিয়া এক খেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি; আমরা একই সুখে-দুঃখে মানুষ, তবু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যোচিত, যাহা ধর্মবিহিত, তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই।’ ৯০ বছর পরে (৪ জুন, ১৯৯৭; আরম্ভ পত্রিকা) রবীন্দ্রনাথের মর্মকথাটি আবার উচ্চারিত হতে দেখি কবি শঙ্খ ঘোষের লেখায় :...‘প্রতিদিনের চর্চায় সেই অনায়াস সম্বন্ধ আমরা গড়ে তুলতে পারিনি, একের উত্সবকে করে তুলতে পারিনি অন্যেরও উত্সব। কিন্তু পারিনি যে, এই বিলাপ নিয়ে চুপ করে বসে থাকবার সময় আর নেই। বাংলাদেশের পরিবেশে, আমাদের বাংলাদেশের এক বন্ধু আবুল মোমেন লিখেছিলেন কিছুদিন আগে, ‘আজ যা দরকার তা হলো, সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর মধ্যে সামাজিক মেলামেশার, উত্সবে পার্বণে সামাজিক যোগাযোগের উপলক্ষ্য তৈরি করে একে অপরের প্রাসঙ্গিকতা অর্জন...।’ মোমেনের এই কথাটির মধ্যে তৈরি-করে-তোলার এই ধারণাটিকে আজ জরুরি বলে মনে হয়। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে সামাজিক মেলামেশার তেমন কোনো ব্যাপক সুযোগ কি আমাদের সামনে প্রস্তুত হয়ে আছে? নাও থাকতে পারে তা। যদি না থাকে, নতুন শতাব্দীর মানুষকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে তার আয়োজন। সেই আয়োজন, যেখানে ধার্মিক মানুষ আর ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ একই সঙ্গে বসতে পারে পাশাপাশি, যেখানে এক সম্প্রদায়ের মানুষ শুধু মানুষ-পরিচয়েই মেলাতে পারেন হাত, যেখানে একের আনন্দ একের উত্সব সঞ্চারিত হয়ে যেতে পারে অন্যের আনন্দে, অন্যের উত্সবে।’

লেখা আর বলার অবকাশে নয় শুধু, একের উত্সবকে সবার উত্সবে সাজিয়ে তোলার মনোহর প্রয়াস আমৃত্যু করে গেছেন শঙ্খ ঘোষ। একসময় বাড়িতে ঈদ করতেন, খাবারদাবারের আয়োজনে বন্ধুদের অংশগ্রহণের দাবি তুলতেন। শেষের দিকে, শারীরিক কারণে জরুরি এ আয়োজন অনেকটা থমকে যায়। তবু নিয়ম করে ফোনে প্রিয়জনদের ঈদের অভিবাদন জানাতেন। উত্সবের ভেতর দিয়ে সম্পর্ক তৈরির এ ভাবনা কি তার একান্ত ব্যক্তিগত? না পর্ব পালনের ভেতরে আর বাইরে যে সর্বজনীন, যে লোকায়ত অভিপ্রায় ছড়িয়ে থাকে, রবীন্দ্রনাথের মতো শঙ্খবাবুও অনুভব করেছিলেন তার বহুধা বিস্তার?

অনেকেই জানি, আবু সয়ীদ আইয়ুবের নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে উঠেছিল রবীন্দ্রমগ্নতা। গীতাঞ্জলি বাংলায় পড়ে দেখবার নিখুঁত আগ্রহ নিয়ে তার গুরু-প্রবেশের শুরু থেকে যে কোনো নিরন্তর বিচরণে, রবীন্দ্রপ্রেমিক দর্শনজাত আকুলতায় প্রায়ই বলতেন, যে কোনো কথা বলতে গেলেই এসে পড়েন তার পান্থজনের সখা। পার্ক সার্কাসে আইয়ুব-গৌরীর বাড়িতেও ঈদের মুহূর্তে একের ভেতরে বহুর অনুশাসনহীন আনন্দ ছুঁয়ে থাকত। আইয়ুব আর শঙ্খ, দুই রবীন্দ্রপথিক তাহলে কি উত্সবের মেজাজেও, তার দর্শনেও খুঁজে পেয়েছিলেন এমন এক সত্যের অভিমুখ, যাকে একমানবের সাধনার বিস্তৃতি বলা ছাড়া উপায় কী?

উত্সবের উত্স আর বিস্তারে এক যেখানে অনেকের ইচ্ছা হয়ে ক্রমাগত নিঃসময়কে ধারণ করতে থাকে, সেখানে সামাজিক নৃতত্ত্বের শাশ্বত, সীমান্তহীন ধারণাকে মানুষ জড়িয়ে ধরে, ছড়িয়েও দেয়। তিন প্রধান সেমিটিক ধর্মের উপলক্ষ্যের সুষমাও সেদিকে। এ কথা আমরা আগেও বলেছি। আবার বলতে হচ্ছে এ কারণেই যে, আমাদের দিন যাপনের অনিঃশেষ অভ্যাসকে ক্ষুদ্রতা আর আরোপিত অবিশ্বাস গ্রাস করতে চাইছে। মূঢ়তার আচরণে বিশ্বাসের নিরীহ, সহজাত সত্যের নির্বাসন দাবি করছে সে। সম্ভব কি এটা? সম্ভব হলেও এ দাবির স্থানিকতা অবশ্যই তাত্ক্ষণিকতায় নির্মূল হয়ে যাবে। কেন এই নিশ্চিত প্রত্যয়? কেন এত আশাবাদী আমরা!

আপাতত উত্সবের রূপ ও রূপান্তর দিয়ে বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার। পশ্চিমি সমাজতাত্ত্বিকরা বারবার বলার চেষ্টা করছেন যে, মুসলিমদের বেশির ভাগ আচার আর অনুষ্ঠানের পরিচয়বাহী শব্দের সঙ্গে হিব্রু শব্দের সাদৃশ্য বিস্তর। যেহেতু মদিনায়, ইহুদিদের পাশাপাশি পর্বপালনে মুসলিমরা উত্সাহিত হয়েছিলেন, যেহেতু কৃষিনির্ভর ঐ অঞ্চলে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বসবাস আর অভ্যাসের গুরুত্ব ছিল, সে কারণে প্রাথমিক স্তরে, পরেও ইসলামের নির্দেশিত পর্বপালনে পূর্বগামী দুই সেমিটিক ধর্মের লোকশাসিত, অনুশাসিত রেওয়াজ গ্রহণযোগ্যতা পায়। ধারণাটি আংশিক সত্য, এ সত্যের বিস্তৃত, ভিন্নতর চেহারাটি কি এড়িয়ে যাব আমরা? রমজান, ঈদ, হজ প্রভৃতি উত্সব ও উত্সবজাত শব্দে কৃষিভিত্তিক সিরিয়া ও প্রাচীন সিরিয়াক জনগোষ্ঠীর জনবিশ্বাসের স্পর্শ কি প্রচ্ছন্ন নয়? এসব কীসের লক্ষণ? কারণ কি এই নয়, অনেকটাই একমুখী তিন সেমিটিক ধর্মসম্প্রদায়ের স্বতঃস্ফূর্ত উত্সবভাবনা আর লৌকিক আচরণ, উর্বরাতন্ত্রে বিশ্বাসী সিরিয়াক জনপদের লৌকিকতার কাছে ঋণগ্রস্ত? না এর কারণ এরকম, একই বংশজাত, এক খাদ্যাভ্যাস, এক আদিভাষা, এক আবহাওয়ায় লালিত বলে কিছুসংখ্যক ভিন্নতা সত্ত্বেও একই ধরনের চরিত্রগুণে সমৃদ্ধ তাদের বিবর্তিত উত্সব, উত্সবের লক্ষ্য! এই লক্ষ্যেরই সমান্তরাল, সাদৃশ্যযুক্ত আর ধারাবাহিক স্রোত একদেশ থেকে আরেক দেশে, পশ্চিমে, পূর্বে ছুটতে ছুটতে মানুষের অনায়াস সম্বন্ধ গড়ার কারিগর হয়ে আছে আজও। তার স্বভাব জারিত, অপূর্ণ ইচ্ছাকে পূর্ণতায় ভরে তুলবার দায়িত্ব আমাদের সবার, একের দায়িত্বকে অন্যেরও দায়িত্বে, অখণ্ডের আকাঙ্ক্ষা পূরণের বাহক উপবাহককে নতুন করে রাঙিয়ে দেওয়া জরুরি। এ রং যেন মর্মে লাগে, আমাদের কর্মে লাগে, লাগে যেন মানুষের ধর্মে।

n লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা