দেশে সর্বশেষ শ্রমশক্তির জরিপ অনুসারে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৮ লাখের ওপরে। প্রতি বছর বেড়েই চলছে বেকারের সংখ্যা। এদিকে কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব এই সংকটকে যেন আরো অতিরিক্ত মাত্রায় ধারণ করতে সহায়তা করেছে। অনার্স পাশ করার পর অধিকাংশ শিক্ষার্থী চাকরির প্রস্তুতি নেন। এদের মধ্যে অনেকেরই চাকরির প্রস্তুতির জন্য বিভিন্ন কোচিংয়ের সহযোগিতা নিয়ে থাকেন। শহরের কোনো অলি গলিতে মেস বাসায় ছোট এক রুমে কষ্ট করে থাকতে হয় এদের। পরিবার থেকে আর্থিক সহযোগিতা পায় কেউ কেউ, তবে অনেকেরই নিজেদের খরচ নিজেদেরকে উপার্জন করতে হয়। চাকরির প্রস্তুতির জন্য বই, খাতা, পত্রিকা ইত্যাদি ক্রয় করতে হয় প্রতিনিয়ত। এছাড়া চাকরির আবেদন, বাসা ভাড়াসহ কোচিং ফি দিতে হয় প্রতি মাসে। অনেকই টিউশন করে কিছু টাকা উপার্জন করে। আর এই টাকা দিয়ে নিজের চলা ও অন্যান্য খরচ মেটানো খুবই কষ্টসাধ্য। চাকরির আবেদনের জন্যই প্রতি মাসে একটা বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। ১ম ও ২য় শ্রেণির অধিকাংশ চাকরির আবেদন করতে প্রায় ৫০০/৭০০/১০০০ টাকা খরচ হয়। সীমিত উপার্জনের মাধ্যমে যেখানে থাকা-খাওয়াই কষ্টকর সেখানে প্রতিটা বিজ্ঞপ্তিতে এতগুলো টাকা যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা!
একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে অনেক গুণ বেশি। আর এই সুযোগ নেন চাকরিদাতারা। আবেদন ফির নামে ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডার সংগ্রহ করে রীতিমতো ব্যবসা করে যাচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান। একবারে চাহিদা মাফিক জনবল নিয়োগ না দিয়ে ইচ্ছা করেই বারবার বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এতে একই প্রার্থী একই প্রতিষ্ঠানে বারবার ব্যাংক ড্রাফট করছেন। সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব চাকরির আবেদনেই পে-অর্ডার বা ব্যাংক ড্রাফট বাবদ গুনতে হয় শত শত টাকা। চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই, ইন্টারভিউ কার্ড কিংবা লিখিত পরীক্ষার প্রবেশপত্র আসবে কি না তারও গ্যারান্টি নেই। অথচ তার আগেই গুনতে হয় আবেদন ফি! আর এ টাকা নেওয়া হয় বেকারদের কাছ থেকে যাদের বেশির ভাগেরই আয়ের কোনো পথ নেই। আবেদন ফি নেওয়া কতটা যৌক্তিক? কারণ হিসেবে নিয়োগকর্তারা হয়তো নিয়োগ-সংক্রান্ত খরচ মেটানোর কথা বলবেন। নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া, উত্তরপত্র মূল্যায়ন প্রভৃতি কাজে খরচ হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ খরচ কেন একজন বেকারের ঘাড়ে এসে পড়বে? কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রয়োজনেই যেখানে নতুন কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়, সেখানে নিয়োগ-প্রক্রিয়ার সব ব্যয়ও বহন করা উচিত তাদের। নিয়োগ-সংক্রান্ত ব্যয় মেটানোর জন্য বাজেটও থাকা উচিত একটি প্রতিষ্ঠানের। প্রতিষ্ঠান যদি পুরোটা বহন না-ও করে, সে ক্ষেত্রে আবেদন ফি এমন হওয়া উচিত, যাতে নিয়োগ-সংক্রান্ত ব্যয়ের অর্ধেক বহন করবে প্রতিষ্ঠান, অর্ধেক চাকরিপ্রার্থীরা। তাও না হলে ফি এমন সহনীয় পর্যায়ে রাখা উচিত। যাতে নিয়োগ-সংক্রান্ত ব্যয় মিটে যায়।
চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে টাকা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার টাকা আছে, তিনি সব প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারছেন। যার নেই, তিনি পারছেন না। চাকরির আবেদন ফি জোটাতে টাকা ধারের জন্যও অনেককে দ্বারস্থ হতে হয় অন্যের। যেসব বিজ্ঞপ্তিতে পদ বেশি থাকে, তাতেই আবেদন করেন অনেকে। লোক কম নেওয়া হলে জেনেশুনে আবেদন ফি জলে ফেলতে নারাজ তারা। এভাবেই অনেক চাকরিতে আবেদন করা হয়ে ওঠে না অনেকেরই, কেবল পকেটে প্রয়োজনীয় টাকা না থাকায়।
উন্নত বিশ্বে বেকারদের কর্মসংস্থান হওয়ার আগ পর্যন্ত সরকার তাদের ভাতা দিয়ে থাকে। আমাদের দেশে ঘটছে উলটোটা। চাকরির বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে চাকরি দেওয়ার নামে চলে চাকরিপ্রার্থীর টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতা। চাকরির আবেদনের সঙ্গে ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার ও পোস্টাল অর্ডারের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার পদ্ধতি বাতিল করা উচিত। এভাবে বেকারদের শোষণ করা রীতিমতো অনৈতিক। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত না হওয়ায় হয়তো বেকারদের ভাতা দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তাদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ব্যবসা করা অমানবিক। চাকরি হোক আর না হোক, অন্তত সবাইকে বিনা ফিতে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। আর আবেদন ফি যদি রাখতেই হয়, তবে তা যেন সবার গা-সওয়া হয়।
পরিশেষে বলতে চাই, চাকরির পরীক্ষায় আবেদন ফি সহনশীল করতে হবে। যাতে করে সব ধরনের পরীক্ষার্থী অংশ গ্রহণ করতে পারে। চাকরি পরীক্ষাগুলো রাজধানী কেন্দ্রিক না হয়ে যার যার জেলা ভিত্তিক হলে প্রতিটি পরীক্ষার্থীদের জন্য সুবিধা হয়। এতে করে তাদের খরচ কম হবে। চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে যারা নির্বাচিত হন তাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া যেন দ্রুততর হয়। কারণ, আমাদের দেশে প্রায় প্রতিটি নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করতে এক থেকে দুই বছর লেগে যাচ্ছে। তাই এই বিষয়ে সোচ্চার হওয়া জরুরি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজধ
