মোস্তফা হত্যা মামলা

জোসেফ, হারিস ও আনিস কি সুবিচার পেয়েছিলেন?

আপডেট : ২০ মে ২০২১, ১০:১৬

মোস্তফা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের এই রায় হতাশার ও বিস্ময়ের। মহামান্য বিচারকের আইনি পর্যালোচনা, সাক্ষীদের সাক্ষ্য পর্যালোচনা এবং আইনি তাত্ত্বিক আলোচনা চরমভাবে অনুপস্থিত। বিচারক মো. আবু হানিফ তার রায়ের ৯৭ পৃষ্ঠায় যে ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন সেটির পরিপ্রেক্ষিতে আসলে তা কতটা ন্যায়বিচারের সমকক্ষ তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবি রাখে। দ্রুত বিচারের ট্রাইব্যুনালের বিচারক তার রায়ের শুরুতেই জানান দেন, তিনি এই মামলায় তিনটি বিষয় বিবেচনা করবেন। কী সেই বিষয়গুলো?

(১) আসামিদের বিরুদ্ধে এবং যেই ধারা অর্থাত্ বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ১৪৩/৩০২/৩৪ ধারায় তারা শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন কি না;

(২) আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যেই সাক্ষ্য ও প্রমাণ এসেছে সেটি সন্দেহাতীতভাবে, অর্থাত্ ‘সন্দেহাতীতভাবে’ (Beyond Reasonable Doubt) প্রমাণিত হয়েছে কি না;

(৩) আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১৪৩/৩০২/৩৪ ধারার অভিযোগে আসামিগণ শাস্তি পেতে পারেন কি না;

এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে মহামান্য বিচারক তার রায়ের আলোচনা ও সিদ্ধান্তে গেছেন এবং রায় প্রদান করেছেন। পরবর্তী আলোচনার শুরুতেই একটি কথা আমাদের জেনে রাখা দরকার যে একটি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনীত অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি JACK B. WEINSTEIN তার গবেষণপত্র ‘Comment on the meaning of ‘proof beyond a reasonable doubt’-এ বলেন, In a criminal case, the law tilts in favour of defendants; it prefers that some guilty go free rather than that some innocents be convicted. The questions are (1) how high the required minimum probability should be set and (2) how should the test be articulated. Quantification is one way of stating the standard.

মোস্তফা হত্যা মামলায় খুব সূক্ষ্মভাবে দেখার বিষয় হচ্ছে বিচারক আসলে তার আইনি পর্যালোচনা কীভাবে করেছেন এবং ঠিক কোন সাক্ষ্যের নথির ভিত্তিতে। একই সঙ্গে প্রত্যেকটি সাক্ষীর প্রবেটিভ ভ্যালুও ঠিক কতটা পর্যালোচনা করতে পেরেছেন, এটিও এখানে বিচার্য। সাক্ষীর মান :ক্রেডিবিলিটি-প্রবেটিভ ভ্যালু বলতে মোটা দাগে বোঝায় সাক্ষীর সাক্ষ্যের মান। যাকে ইংরেজিতে বলা যেতে পারে ‘উইটনেস ক্রেডিবিলিটি’।

সহজ ভাষায় বললে বলা যেতে পারে একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য আদালত ঠিক কীভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে? কীভাবে একজন সাক্ষ্যের সাক্ষীকে আদালত বিশ্বাস করে কিংবা সঠিক বা সত্য বলে মনে করেন? প্রবেটিভ ভ্যালু হচ্ছে এমন একটা ব্যাপার, যেখানে একজন সাক্ষী যখন কোনো একটি মামলায় সাক্ষী দেন সেই ঘটনার সঙ্গে সাক্ষীর সম্পর্ক ঠিক কী ছিল, সাক্ষী ঘটনাস্থলের কতটুকু কাছে ছিলেন, ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রতিটি বিষয় সাক্ষী ঠিক কীভাবে বলতে পারলেন, যেখানে পুরো ঘটনার অস্তিত্ব ও বিবরণ আদালতের কাছে চাক্ষুষ সহয়ে ওঠে।

এই প্রবেটিভ ভ্যালু নির্ধারণ করতে সাক্ষীর নিজের অবস্থান বিবেচনায় আরো অনেক কিছুই আদালত দেখেন। যেমন এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অনেক সাক্ষী এসেছেন, যারা দীর্ঘ সময় ধরে এই অভিযুক্তদের পক্ষে রাজনীতি করেছেন, ব্যবসায় করেছেন কিংবা এইসব অভিযুক্তদের কাছ থেকে নানাভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা পেয়েছেন। এইসব ঘটনা সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতাকে অনেকাংশে কমিয়ে দেয় এবং ফলে সেই সাক্ষীর ‘প্রবেটিভ ভ্যালু’ আদালত খুব একটা বিবেচনায় নেন না।

প্রসঙ্গতভাবে প্রশ্ন এসেই যায়, মহামান্য বিচারপতি এই ‘বিয়ন্ড রিজেনেবল ডাউট’ তত্ত্ব কিংবা সাক্ষ্যের ‘প্রবেটিভ ভ্যালু’ এমন প্রশ্নে কতটা জোর দিয়েছিলেন? আদৌ কি এই মামলার আসামিরা তাদের প্রাপ্য ‘সঠিক বিচার’ কিংবা ‘সুবিচার’ অধিকারের আওতায় ছিলেন নাকি এই মামলার রায়ের ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনকভাবে আমরা দেখতে পেয়েছি মহামান্য বিচারকের রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের একের পর এক অসংগতিগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া, তাদের তীব্র সাংঘর্ষিক বক্তব্যকে বিচারকের চিন্তার বা প্রশ্নের আতশ কাচের নিচে না আনা ইত্যাদি?

হতাশার সঙ্গে বলতে হয় বিচারক এই মামলায় (১) যথাযথ আইনি পর্যালোচনা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন (২) সাক্ষীদের সাক্ষ্যের সমস্ত অসংগতি-সাংঘর্ষিক বক্তব্য-মূল জবানবন্দির বাইরের বক্তব্য পর্যালোচনা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এই রায়ের ৮৭ নম্বর পৃষ্ঠার প্রথম প্যারার মধ্য অংশে লক্ষ করলে হতভম্ব হওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না। বিচারপতি তার রায়ে বলছেন—

‘আসামি জোসেফ এবং আসামি মাসুদ তাহার স্বামী মোস্তফাকে কীভাবে গুলি করিয়াছে এই বিষয়ে সামান্য গরমিল হইতে পারে।’ চিন্তা করা যায়? একজন মহামান্য বিচারক তার রায়ে একটি হত্যা মামলায় মূল বাদীর বক্তব্যের পুরো উলটো ভার্শন বলবার পরেও সেটিকে অবহিত করছেন ‘সামান্য গরমিল হিসেবে’ যেখানে মামলার বাদী রাশেদা পারভীন বলছেন—

‘আসামি মাসুদ মোস্তফার পিস্তল দিয়ে মোস্তফার বুকের নিচে দুটি গুলি করে রক্তাক্ত ও জখম করে আর জোসেফ মোস্তফার লাইসেন্স করা পিস্তল মোস্তফার হাত থেকে নিয়ে গিয়ে মোস্তফার ডান পায়ের গোড়ালি ও পায়ের ঊরুতে দুটি গুলি করে।’

মাসুদের এই পেটে আর বুকে গুলি করা ট্রায়ালে এসে পালটে গেছে জোসেফ পেটে আর বুকে গুলি করেছেন আর মহামান্য বিচারক এটিকে উল্লেখ করছেন ‘সামান্য গরমিল’ হিসেবে। একটি হত্যা মামলায় যেখানে একজন মানুষের জীবন আর মৃত্যুর প্রশ্ন নির্ভর করছে পুঙ্খানুপুঙ্খ ফ্যাক্ট, সাক্ষী, যুক্তির ওপর সেখানে মহামান্য বিচারক এই জীবনের দামকে টেনে এনে নামিয়েছেন ‘সামান্য গরমিলে’। মানুষ হিসেবে বিচারকের এই বক্তব্যে হোঁচট খেতে হয়, প্রশ্ন চলেই আসে মানুষের জীবন কি ঠিক এতটাই সহজ কিংবা সস্তা?

আমি আমার এই সিরিজের ৪র্থ পর্বে লিখেছিলাম—‘একই ঘটনায় চাক্ষুষ সাক্ষী দাবি করা স্বাধীন বলছে এক কথা এবং এই মামলার বাদী অর্থাত্ মোস্তফার স্ত্রী মিসেস রাশেদা পারভীন বলছেন সম্পূর্ণ অন্য কথা। একটি ফৌজদারি মামলায় এই ধরনের তীব্র ও স্পষ্ট জবানবন্দির বিপরীতমুখী বক্তব্য আমাদের বিস্ময় জাগায়। আরো উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এজাহারের বাইরে যখন মামলার এই ১ নম্বর সাক্ষী তার জবানবন্দি দেন সেখানে তিনি নিশ্চিত করেন যে তিনি এজাহারে যা বলেছেন তা তিনি তার স্বামীর কাছেই শুনে বলেছেন আবার মামলার নথিতে জেরার একপর্যায়ে দেখা যায় সাক্ষী রাশেদা পারভীন মুহূর্তেই তার বক্তব্য পরিবর্তন করে বলছেন যে, তার স্বামী তাকে কী বলেছেন সেটা তিনি ভালো করে শোনেন নাই। তবে জবানবন্দিতে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে আসামি মাসুদই তার স্বামীকে গুলি করেছেন, যেটা তিনি তার স্বামীর কাছ থেকেই শুনেছেন।’

এই পুরো ব্যাপারকে বিচারক মো. আবু হানিফ সামান্যতমভাবে আমলে নেননি, এই বিষয় নিয়ে তিনি যে একটি আইনি পর্যালোচনার প্রয়োজন অনুভব করেন, তাও কোথাও উল্লেখ করেননি, অন্তত এই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের রায়ের এই ১০১ পাতার দীর্ঘ রায়ে তা দেখা যায়নি।

এই মামলার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় লক্ষণীয় বিষয় ছিল, অভিযুক্ত আনিস আহমেদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের যারা যারা এসেছেন সেখানে অভিযুক্ত আনিসের সম্পৃক্ততার ব্যাপারটি অত্যন্ত ক্ষীণ, দুর্বল এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যাহীন। একটি সাক্ষীকে দেখা যায়নি তারা বলতে পেরেছেন যে আনিস আহমেদ ঐ ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন, তার কী ভূমিকা ছিল, তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কাকে আহত করেছেন, গুলি করেছেন কিংবা কী অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। যতগুলো সাক্ষী ছিলেন তারা গুনে গুনে প্রত্যেকেই আনিস আহমেদের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত নীরব।

বিচারক মো. আবু হানিফ ঠিক কীসের ভিত্তিতে আনিস আহমেদকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় প্রদান করেছেন সেটা কয়েকবার রায়টি পড়বার পরেও আমার কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বিচারপতি যখন এই সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আইনি নজির টেনেছেন তার রায়ের ৯৫ পৃষ্ঠায় যে কয়েকটি মামলার নজির উপস্থাপন করেছেন তার কোনো বিস্তারিতই এই মামলায় বলা হয়নি যে তিনি আলোচ্য মামলার ক্ষেত্রে ঠিক কোন পর্যালোচনার সূত্রে উক্ত নজিরকে যথার্থ মনে করেন। কেবল ‘common intention’ তত্ত্বের নজির আর সেটা আলোচ্য মামলার সঙ্গে সামান্যতম সম্পর্কের যে দূরত্ব, সেটি ঠিক কোন উপায়ে নিরূপিত হয়েছে কিংবা কীভাবে সম্পর্কিত হয়েছে এর একটি জবাবও আমরা এই মামলার রায়ে পাই না।

একই সঙ্গে মহামান্য বিচারপতি তার রায়ের ৯১ পৃষ্ঠায় যে মৃত্যুকালীন বিবৃতির নজির আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন সেক্ষেত্রেও কিন্তু তিনি ঠিক কী উপায়ে নিহত মোস্তফার এই বিবৃতির মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন কিংবা কীভাবেই-বা তার মানসিক সুস্থতাকে নিরূপিত করেছেন সে উত্তরও তিনি দেননি। যেখানে আমি আগের লেখায় স্পষ্ট বলেছিলাম—

রাশেদ বনাম রাষ্ট্র মামলা (৭২ ডিএলআর) আদালত জানান, মৃত্যুকালীন বিবৃতির জন্য তিনটি মানদণ্ডের প্রয়োজন। (১) অন্তর্নিহিত সত্য কি না, (২) মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে তার আক্রমণকারীকে শনাক্তকরণ বা নামকরণের ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না এবং (৩) এটি বাইরের কোনো পক্ষের অনুরোধমুক্ত এবং মামলার অন্যান্য প্রমাণ এবং পরিস্থিতিগুলোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না।

একইভাবে মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন এসেছিল যে, ‘ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি রয়েছে’—এই মর্মে বিবেচনায় নেওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ যে আহত ব্যক্তির মনের অবস্থা ভালো ছিল। একইভাবে রাষ্ট্র বনাম বাদল মিয়া মামলায় (২৪ বিএলডি) বলা হচ্ছে, যিনি মৃত্যুকালীন বিবৃতি যিনি দেবেন, তিনি সচেতন ও স্বাভাবিক মনের অধিকারী ছিলেন কি না সেটিও আদালত দেখবেন, এই ক্ষেত্রেও বিচারপতি মোহাম্মদ আবু হানিফের আইনি পর্যালোচনার অনুপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মহামান্য বিচারক মো. আবু নিজেই বলছেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা আবার তার রায়ের ভেতরে আমরা একটি রায়ের যেই বেসিক উপাদানগুলোর উপস্থিতি আশা করতে পারি, তার প্রত্যেকটিকে আমরা অনুপস্থিত দেখতে পেয়েছি। একটি হত্যা মামলার রায়ের ওপর যেখানে শুধু অভিযুক্ত আসামিই নয় বরং তাদের ঘিরে থাকা পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজনও সংশ্লিষ্ট থাকে। এই ধরনের বিচারের ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়া, পুরো পদ্ধতি এবং পর্যালোচনাকে আমরা খুব সহজেই আশা করি যে সেগুলো যাবে যুক্তির সর্বোচ্চ আতশি কাঁচের ভেতর দিয়ে, সেখানে রায়ের মধ্যে এত এত আইনি ত্রুটি, পর্যবেক্ষণের তীব্র অপর্যাপ্ততা, আইনি ব্যাখ্যার অনুপস্থিতি তথা সাক্ষ্যের ক্রেডিবিলিটি বা মূল্যমান কিংবা প্রবেটিভ ভ্যালুকে নিরূপণের সমস্ত মাপকাঠি উপেক্ষিত, তখন প্রশ্ন এসেই যায়, এই উক্ত মামলাতে কি আসামিরা আদৌ সুবিচার পেয়েছিলেন? তারা কি তাদের প্রাপ্ত সমস্ত অধিকার পেয়েছিলেন? তারা কি বিচারকের কাছ থেকে তাদের ‘প্রাপ্য’ সমস্ত আইনি তত্ত্বের সর্বোচ্চ ব্যবহার কিংবা পর্যালোচনা ফলাফল পেয়েছিলেন? অন্তত আমার পর্যালোচনা বলছে, না। এই মামলায় আসামিরা তীব্রভাবে উপেক্ষিত হয়েছেন, তাদের সমস্ত প্রাপ্য অধিকার উপেক্ষিত হয়েছে এবং তারা সুবিচার পেয়েছেন—এই কথা বলাই যায় না। (আগামী পর্বে সমাপ্ত)

লেখক: আইনজীবী

ইত্তেফাক/জেডএইচডি