মধুর তোমার শেষ যে না পাই

আপডেট : ২০ মে ২০২১, ২০:৫৯

বিখ্যাত পণ্ডিত ও রবীন্দ্র গবেষক নীরদচন্দ্র চৌধুরী তার ‘আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ’ বইতে লিখেছেন— ‘রবীন্দ্রনাথের নিন্দুকদের মধ্যে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা অল্পসংখ্যক ছিলেন না। যে ব্যক্তি ডিগ্রীধারী নয়, এমন কি এন্ট্রেস পরীক্ষাও পাশ করে নাই, তাঁহারা সেই ব্যক্তির বাংলা ভাষার জ্ঞান পর্যন্ত আছে তাহাও স্বীকার করিতে প্রস্তুত ছিলেন না। ...বরঞ্চ ইংরেজিতে বই লেখা (রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক) অমার্জনীয় স্পর্ধা বলিয়াই মনে করিয়াছেন।’ তিনি একটি জায়গায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখেছিলেন—‘এত মহান ও এত বহুমুখী প্রতিভাবান ব্যক্তির এমন দুঃসময় জীবনের কথা আমি কোনো দেশের সাহিত্যিক ইতিহাসে পড়ি নাই।’ রবীন্দ্রনাথের মতো এমন মহামানবের প্রতি এমন নোংরা সমালোচনাকে তিনি ‘ইতরতার শেষ সীমা’ বলেছেন। আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি সেই সময় তো বটেই পরবর্তীকালে এমন অনেক ‘ইতর’দের দ্বারা তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন, ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তাতে কি তার গৌরব এতটুকু ক্ষুণ্ন হয়েছে? বরং শতগুণে বেড়েছে।

অনেকে বলেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করেছেন; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রতি তার যে সমালোচনা তা যেন বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে বটবৃক্ষের প্রতি অভিমান আর আক্ষেপ। তিনি বলেছেন, ‘রবীন্দ্র অনুসারীদের অত্যাচারে আমরা বন্ধুরা দিনের আড্ডাতে রবীন্দ্রনাথের কঠোর সমালোচক হয়ে উঠতাম, আর রাতে হয়ে উঠতাম তার ভক্ত; আমরা লেখক বন্ধুরা কে কয়টি রবীন্দ্রসংগীত জানি তারও প্রতিযোগিতা হতো।’ প্রখ্যাত লেখক হুয়ায়ুন আজাদ বলেছেন—‘রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রতিদিনের সূর্য।’

রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন পাহাড়ের পাদদেশে বসে পাহাড় দেখার মতো—যত পাহাড়ের কাছে যাই পাহাড়ের অনুপম ব্যাপ্তি যেন বেড়েই চলে। যেন ‘মধুর তোমার শেষ যে না পাই।’ তাই পাহাড়ের পাদদেশে বসে পাহাড়ের বিশালতা ‘নিরীক্ষণ’ এবং এর ‘অনুপম ঐশ্বর্য’ অনুভব করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

এবার আসি ‘নিরীক্ষণ’ আর ‘ঐশ্বর্য অনুভবের’ কথায়। আমরা যারা রবীন্দ্রনাথ পড়ি তারা অনেকে বাঙালি বলে রবীন্দ্রনাথ পড়তে হয়, না হলে মান থাকে না—তাই পড়ি। অনেকটা রবীন্দ্রনাকে নিয়ে আমাদের বাঙালির জন্মগত ‘ইগো’। এরমধ্যে অনেকে আমরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা বা গবেষণা করি; কিন্তু একে কি রবীন্দ্র পাঠ বলা যায়? আপনি পরীক্ষা করে কারো শরীরে ঢুকতে পারবেন ঠিক; কিন্তু তার হূদয়ের গভীরে কি প্রবেশের অধিকার পাবেন? হূদয়ে প্রবেশ করতে হলে চাই ভক্তি, চাই প্রেম, চাই সমর্পণ। শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ না দেখা পর্যন্ত অর্জুন কিন্তু তাকে ঈশ্বর মানেননি। স্বামী বিবেকানন্দকে শ্রীরামকৃষ্ণদেব স্পর্শ না করা পর্যন্ত বিবেকানন্দ ঈশ্বর দর্শন করতে পারেননি। এই স্পর্শ হচ্ছে বিভূতিযোগ, আত্মার সঙ্গে আত্মার মিলন। তবে ঈশ্বরকে জানার মাধ্যম এখানে কি? উত্তর ভক্তি এবং প্রেমের উত্কর্ষ স্তর।

তেমনি একজন মহামানবকে তর্ক বা পরীক্ষানিরীক্ষা করে জানা যায় না। তাকে জানতে হলে সৃষ্টির গভীর থেকে জানতে হয়। তার ধ্যান করতে হয়, আত্মার সঙ্গে আত্মার মিলন ঘটাতে হয়, ভক্তির চরম স্তরে পৌঁছাতে হয়; তা না হলে যে জানা হয়ে থাকে তা শুধু ‘জানার অহংকার’, শুধু ‘গ্রন্থগত বিদ্যা’। রবীন্দ্রনাথ যিনি একাধারে কবি, লেখক, দার্শনিক, চিত্রকর, সুরকার, গীতিকার, সংগঠক, রাজনীতিক; একজন বাঙালি হিসেবে কী পরিচয় নাই তার? তিনি তত্কালীন সময়ে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে সভ্য মানুষের কাছে সমাদৃত হয়েছেন, ইউরোপের প্রখ্যাত কেউ কেউ তার সৌম্য বিভূতি দেখে তাকে যিশু খ্রিষ্টের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাই রবীন্দ্রনাথকে শুধু একটি পরিচয়ে আবদ্ধ করানো ঠিক হবে না। স্বয়ং নজরুল ইসলাম যাকে বলেছেন—‘তিনি (রবীন্দ্রনাথ) গ্রহমণ্ডলীর মধ্যে সৌরজগতের দেদীপ্যমান সূর্য।’

তাই এসব মহাসামুদ্রিক মহামানবকে দুইশত বা হাজার বছরের গণ্ডি বা একটি নোবেল প্রাইজ দিয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। এতে যদিও তাত্ক্ষণিকভাবে মনে হয় তাকে এসব প্রাইজ দিয়ে বড় করা হয়েছে—কিন্তু আর ১০ জনের ভিড়ে এসব মানুষকে হাটে-বাজারের দ্রব্যের মতো ওজনে দাঁড় করিয়ে এদের গৌরব ক্ষুণ্ন করা হয়। সুতরাং রবীন্দ্রনাথ এবং এমন মহামানবকে ‘অনুভব’ করতে হলে কোনো পরিমাপের দরকার নেই, কোনো বাটখারা বা ব্যারোমিটার প্রয়োজন নেই; চাই আত্মার বিভূতিযোগ, ভক্তির নৈবেদ্য, হূদয়ের ব্যাকুলতা এবং আত্মসমর্পণ।

n লেখক :কবি, ব্যাংকার ও সমাজকর্মী