সনাতন বিবাহে বিলাসী আয়োজন

আপডেট : ২১ মে ২০২১, ২১:৩০

সনাতন ধর্ম দর্শনে দশবিধ সংস্কারের অন্যতম প্রধান সংস্কার হচ্ছে বিবাহ। পবিত্র এই বিবাহ পূজা, যজ্ঞ ও মাঙ্গলিক বৈদিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হয়ে থাকে; যা ধর্মীয়ভাবে খুবই গুরুত্ব বহন করে। শাস্ত্রানুযায়ী কন্যাকে সামর্থ্য অনুযায়ী বস্ত্র ও অলংকার দ্বারা আচ্ছাদন করে সত্পাত্রে সম্প্রদান করাই উপযুক্ত বিবাহ। কিন্তু আজ বিবাহ গরিব, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারের কন্যাদায়গ্রস্ত বাবা-মায়ের জন্য হূদয়ের রক্তক্ষরণ।

আজকাল বিবাহের লাগামহীন খরচ ও নীরবে যৌতুক প্রথা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কন্যাদায়গ্রস্ত বাবা-মাকে পথে বসানোই যেন মুখ্য উদ্দেশ্য। আজ আপনি আপনার জমি অথবা শেষ সম্বল বিক্রি করে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন; কিন্তু একদিন আপনার ছেলে বা মেয়ের কন্যাসন্তান হলে তারা কী বিক্রি করবে! একবার কি ভেবে দেখেছেন? কোনো পরিবারে যদি একাধিক কন্যাসন্তান থাকে তাহলে সে বাবা-মায়ের চোখে ঘুম আসে না; তার কারণ ঘুণে ধরা সমাজের অপসংস্কৃতির প্রসার।

বরপক্ষের মেয়ে পছন্দ হলে বলে, আমাদের কোনো দাবি নেই, শুধু বরযাত্রীদের জন্য ভালো খাবারের আয়োজন ও মেয়েকে সাজিয়ে দেবেন। দাবি না করা মানে সবকিছু দেওয়া; যার অর্থ হচ্ছে নীরবে যৌতুক। এবার শুরু করি মেয়ের আশীর্বাদ অনুষ্ঠানে ৫০ থেকে ১০০ জন, বিবাহসহ সব অনুষ্ঠান অবশ্যই কমিউনিটি সেন্টারে করতে হবে; ঐ দিন লগ্ন যদি বেশি থাকে তাহলে এক-দুই লাখ টাকা পর্যন্ত কমিউনিটি সেন্টারকে ভাড়া দিতে হয়। বিয়ের দিন ৪০০ থেকে ৮০০ জনের জন্য খাসির মাংস, মুরগির মাংস, কবুতরের মাংস, চিংড়ি মাছ, পোলাও, কোরাল মাছ, পায়েস, মিষ্টিসহ দশ-বারো রকমের উচ্চবিলাসী খাবারের আয়োজন করতে হয়। তারপর যুগ অনুযায়ী টিভি, ফ্রিজ, ফার্নিচার, মোটরসাইকেল ও চার থেকে সাত ভরি স্বর্ণালঙ্কারসহ আরো কত পণ। বিয়ের পর জামাইভাতা, বিয়াইভাতা, জামাই ষষ্ঠীসহ আরো কত অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বরপক্ষ ও সমাজ মিলে কনের পিতার দীর্ঘদিনের অর্জিত সঞ্চয় যেন লুটেপুটে খাওয়া। কন্যাদায়গ্রস্ত একজন পিতার পক্ষে এই অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করতে কত খরচ হবে একবার ভেবে দেখুন। আমরা কোন সমাজে বসবাস করছি!

এইভাবে নীরব যৌতুক প্রথা হিন্দু সমাজে দিন দিন প্রকোপ আকার ধারণ করছে। অন্যান্য ধর্মের লোকেরা তাদের নিজ নিজ উপসনালয়ে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে। ৮০-৯০ দশকের দিকে ক্লাবভিত্তিক বিবাহ প্রচলন ছিল না; কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে কিছু মানুষের আরাম-আয়েশের জন্য ক্লাবভিত্তিক বিবাহের প্রচলন শুরু হয়, যা সম্পূর্ণ শাস্ত্রবিরোধী। প্রাচীনকাল থেকে মাঙ্গলিকভাবে বিয়ে হয়ে আসছে মন্দিরে। ক্লাবভিত্তিক বিবাহ মানে অশুচি ও তামসিক। মন্দিরভিত্তিক বিবাহে স্বাত্তিকতা বজায় থাকে ও আর্থিকভাবে সাশ্রয় হয়। আজ থেকে ২০০ বছর আগে নব জাগরণের অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজের বিভিন্ন কুসংস্কার, ব্রাহ্মণ সমাজ, উচ্চ ও নিচু শ্রেণির জাতপাত, সমাজের অসংগতি সংস্কার করেছিলেন। ওরা করেছে তাই আমাকে করতে হবে—এই নীতি বিলুপ্ত করতে হবে। যার যতটুকু সামর্থ্য ততটুকু করা, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া নয়। তাই আজ সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে বিবাহের নামে এত বিলাসী আয়োজনের মতো নীরব যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে পুনঃজাগরিত হতে হবে। আর কোনো পিতার যেন সম্পদ বিক্রি করতে না হয় এবং কারো কাছে হাত পাততে না হয়। বাবা-মায়ের কাছে কন্যাসন্তান বোঝা নয়, বোঝা হচ্ছে ঘুণে ধরা আমাদের অপসংস্কৃতি ও কুসংস্কার।

চট্টগ্রাম