মেঘনা নদীর তীরবর্তী মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার জনপদ ক্ষমতাসীনদের দ্বন্দ্বে রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। মেহেন্দিগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচন ও স্থগিত থাকা ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিগত ছয় মাসে কমপক্ষে ১০টি সশস্ত্র সংঘর্ষে উভয় পক্ষের পাঁচ জন নিহত এবং অন্তত দুই শতাধিক লোক আহত হয়েছেন। সেই সঙ্গে আহত হয়েছেন ১০ জন পুলিশ সদস্যও। উপজেলা আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে এসব সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছেন। পুলিশের উপস্থিতিতে ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মহড়া এবং সংঘর্ষ চলতে থাকায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকা থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাগিদ দিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা।
স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, আধিপত্য বিস্তারসহ মাদক, টেন্ডারবাজি, নদীর তীরবর্তী মাছঘাট দখল, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং চর দখলসহ নানা কারণে বিবাদে জড়াচ্ছেন নেতাকর্মীরা। তবে আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর না হওয়ায় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে এক পক্ষ অন্যপক্ষের ওপর হামলা চালানোর সাহস পাচ্ছে। এসব হামলাকারী পরবর্তী সময়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হওয়ার কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
মেহেন্দিগঞ্জের এ জনপদকে বসবাসযোগ্য করতে হলে অবিলম্বে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান আরজু। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, দলকে ব্যবহার করে এক শ্রেণির লুটেরা সবকিছু দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এসব দখলবাজ ক্ষমতাধরদের ছত্রছায়ায় সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান এবং জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুনসুর আহমেদও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানিয়ে বলেন, দখলদারদের হত্যাযজ্ঞে আতঙ্কিত হয়ে দলের অনেক নেতাকর্মী এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে মেহেন্দিগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ কর্মী আফসার হোসেন সিকদারকে হত্যা করে প্রতিপক্ষরা। এর আগে গত ৪ ডিসেম্বর মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার নবগঠিত উত্তর ও দক্ষিণ উলানিয়ার স্থগিত হওয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেখানকার বিবদমান আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সংঘর্ষে সাত পুলিশ সদস্যসহ অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন। পুলিশ সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৪৬ রাউন্ড গু?লিবর্ষণ করে। সেসময়ে পুলিশ আহতের ঘটনায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৬০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়াও কয়েকটি হামলা-পালটা হামলার ঘটনায় আরো ছয়টি মামলা দায়ের হয় তখন। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল ভোররাতে দক্ষিণ উলানিয়ার সুলতানী গ্রামে হামলা চালায় প্রতিপক্ষের চার শতাধিক লোক। দুই পক্ষের মধ্যে বেঁধে যায় সংঘর্ষ। সংঘর্ষে সেখানকার চেয়ারম্যান প্রার্থীর লোক হিসেবে পরিচিত সাইফুল সর্দার এবং প্রতিপক্ষ গ্রুপের সাঈদ চৌধুরী নিহত হন। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের শতাধিক লোক আহত হন। ঐ গ্রামের বেশ কয়েকটি বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার মেহেন্দিগঞ্জ উলানিয়া (উত্তর) ইউনিয়নের সলদি এলাকার বাসিন্দা ইউপি সদস্য রবী ঢালির নাতনির বিয়ের অনুষ্ঠানে ধুলখোলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম বেপারীর ৫০ থেকে ৬০ জন কর্মী-সমর্থক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই স্থানীয় সামছুল হক কবিরাজের ছেলে দিনমজুর সিদ্দিকুর রহমান ও পরে চিকিত্সাধীন অবস্থায় জামাল উদ্দিন ঢালীর ভাই ছত্তার ঢালী নিহত হন। এছাড়াও হামলায় প্রায় ২৫ জন গুরুতর আহত হয়। এছাড়া গত ৬ মে মেহেন্দিগঞ্জের শ্রীপুর ইউনিয়নে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি খুন হন। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই দেলোয়ারের সঙ্গে প্রতিপক্ষ খালেক হাওলাদারের কথা কাটাকাটি হয়। এর জের ধরেই খালেক হাওলাদারের ছেলে ফারুক হাওলাদার ও চাঁন হাওলাদার পিটিয়ে হত্যা করে দেলোয়ার হাওলাদারকে।
মেহেন্দিগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম জানান, বৃহস্পতিবারের সংঘর্ষের ঘটনায় গতকাল শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত ১৮ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে উল্লেখ করে ওসি জানান, ঐ মামলায় তাদেরকে গ্রেফতার দেখানো হবে।
মেহেন্দিগঞ্জের সার্কেল এসপি সুকুমার রায় বলেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে দুই পক্ষ। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
