১৯৭১ সাল। ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার গোয়াতলা বাজার মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প। ক্যাম্পের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ইপিআর সদস্য এ কে মোহাম্মদ আলী। ৩ অক্টোবর দিনভর অপারেশন চালানোর পর মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্পে ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে অতর্কিত হামলা চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারাও তাদের অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। গভীর রাতে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে চলে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি। এক পর্যায়ে ক্যাম্পের ভেতর ইপিআর সদস্য এ কে মোহাম্মদ আলী গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন। অন্য মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করতে করতে ক্যাম্প ত্যাগ করে। সেই যুদ্ধে মোহাম্মদ আলীসহ চার জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন।
মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হওয়ার চার দিন আগে মোহাম্মদ আলী এক পুত্র সন্তানের জনক হন। সে খবরটিও তিনি জানতে পারেননি। ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার নগুয়া গ্রামে বাবার বাড়িতে রেখে গিয়েছিলেন তার স্ত্রী রাবেয়া বেগম ও দুই বছর বয়সের পুত্র সন্তান মঞ্জুরুল হক রতনকে। মুক্তিযুদ্ধের পর ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও শহিদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি।
এ কে মোহাম্মদ আলীর বড় ছেলে মঞ্জুরুল হক রতন বর্তমানে তারাকান্দা উপজেলার নগুয়া গ্রামে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ১৯৭১ সালে তার বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হওয়ার পর পৈতৃক সম্পত্তি তার কপালে জোটেনি। অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে অনেকটা দীনহীন অবস্থায় জীবন-যাপন করছেন।
মঞ্জুরুল হক রতন বলেন, স্বাধীনতার পর কত জনের কাছে গেলাম বাবার শহিদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য। কেউ আমাদের একটু সহায়তাও করল না। মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সঙ্গে যোগাযোগ করি আমরা। তারা জানায় যে বাবা যেহেতু বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, তাই সেখান থেকেই এই মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নথিভুক্ত করা হবে। পরবর্তী সময়ে আমরা ২০১৪ সালের ২৩ এপ্রিল বিজিবির মহাপরিচালক বরাবর একটি আবেদন করি। ঐ আবেদনে আমার বাবার মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হওয়ার বিস্তারিত তথ্য ও তার সহযোদ্ধাদের প্রত্যয়ন পত্র জমা দেওয়া হয়েছে। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার পর বিজিবির রেকর্ড শাখা থেকে একজন ফোন করে তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে নেন। এরপর ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো আমাদের কপালে বাবার শহিদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মিলেনি।
মুক্তিযুদ্ধে স্বামী শহিদ হওয়ার পর তারাকান্দার নগুয়া গ্রামে শ্বশুরবাড়ি থেকে রাবেয়া বেগমকে দুই কোলের শিশুসহ বের করে দেওয়া হয়। রাবেয়া বেগম আশ্রয় নেন নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার ভূগী গ্রামে বাবার বাড়িতে। স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী সরকার প্রত্যেক শহিদ পরিবারকে ২ হাজার টাকা প্রদান করে। ঐ টাকাটুকুই রাবেয়া বেগমের কপালে শহিদ মুক্তিযোদ্ধা স্বামীর স্বীকৃতি। এরপর থেকে কোনো অনুদানও তার কপালে জোটেনি।
পরবর্তী সময়ে এ কে মোহাম্মদ আলীর সহযোদ্ধাদের চেষ্টায় ১৯৮৬ সালে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ১ম খণ্ড ও ২য় খণ্ডে (ময়মনসিংহ ১২টি উপজেলা) তার নাম ফুলপুর উপজেলার তালিকায় ১ নম্বর শহিদ মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেন। পরে বিভিন্ন সময়ে সরকার নতুন করে মুক্তিযোদ্ধার নাম যাচাই-বাছাই করে তালিকভুক্ত করলে মোহাম্মদ আলীর নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়।
এই অবস্থায় স্বামীর শহিদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে থাকেন রাবেয়া বেগম। অনেক কষ্ট করে তিনি তার দুই সন্তানকে বড় করেন। এরই মধ্যে ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি রাবেয়া বেগম পরপারে পাড়ি জমান।
এ কে মোহাম্মদ আলীর মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাঁথা জানিয়ে তারাকান্দা উপজেলার কামারিয়া ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার খাদেমুল ইসলাম বলেন, মোহাম্মদ আলী ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পর বিদ্রোহ করে ঢাকার পিলখানা থেকে অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে যান। ময়মনসিংহের তারাকান্দায় তার নিজ গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। এলাকার যুবকদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন।
বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলামের বক্তব্যের জন্য লিখিত আবেদন করা হয়েছে। তবে বিজিবির জনসংযোগ দপ্তরের প্রধান শরীফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি যাচাই-বাছাই করার জন্য বিজিবির রেকর্ড উইংকে জানানো হয়েছে। সেখান যাচাই-বাছাই করে দেওয়া তথ্যই জানানো হবে।
