অবাক পৃথিবী ইমুযুদ্ধ

আপডেট : ২৩ মে ২০২১, ০০:১২

 

পৃথিবীর কোনো দেশের আধুনিক সামরিক বাহিনী রীতিমত ঘোষণা দিয়ে পাখির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে—এমনটি কখনো শুনেছেন? ঘটনাটি ঘটেছিল অস্ট্রেলিয়ায়, দ্য গ্রেট ইমু ওয়ার পৃথিবীর অদ্ভুত যুদ্ধগুলোর একটি।

ইমু অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পাখি। দেখতে অনেকটা উটপাখির মতো, লম্বায় সাড়ে পাঁচ ফুট উঁচু। ইমু পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম পাখি। উটপাখির মতো ইমুও উড়তে পারে না, তবে প্রচণ্ড গতিতে দৌড়াতে সক্ষম। প্রধানত তৃণভোজী পাখিটি পোকামাকড় খেলেও মাংসাশী নয়।

কী এমন হয়েছিল যে পাখিরা যুদ্ধের কারণ হয়ে ওঠে? বিষয়টি জানার জন্য আমাদের ১০০ বছর পিছনে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যুদ্ধফেরত হাজার হাজার সৈন্যের জীবিকা নির্ধারণে বিপাকে পড়েছিল অস্ট্রেলিয়ান সরকার। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কৃষিকাজের জন্য তাদেরকে জমি বণ্টন করে দেওয়া হবে। সৈন্যরা বিভিন্ন স্থানে জায়গা-জমি নিয়ে খেতখামার করা শুরু করল। ১৯৩২ সালের দিকে হঠাত্ অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম অঞ্চলগুলোতে ইমু পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেল। দলে দলে তারা খেতখামারের সমস্ত ফসল নষ্ট করতে লাগল। ইমু পাখিদের তখন বাঁশ আর তারকাটার বেড়ার মধ্যে রাখা হতো। তবে সে সময় চলমান মহামন্দা কিংবা গ্রেট ডিপ্রেশনের কারণে চাষিরা সেই বেড়ার ব্যবস্থাটুকুও করতে পারছিল না। প্রায় বিশ হাজার ইমু পাখি গম-ভুট্টার খেতে ঢুকে সব মাড়িয়ে, ছড়ানো-ছিটানো শুরু করল। একে অর্থনৈতিক অবস্থার করুণ দশা, তার ওপর এমন তাণ্ডবে কৃষকদের মাথায় হাত! ইমু পাখিদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অধিকাংশই আগে সৈন্য ছিলেন; তাঁরা যান তত্কালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জর্জ  পিয়ার্সের কাছে। কেন্দ্রীয় সরকারকে না জানিয়েই জর্জ পিয়ার্স ইমুদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য দুটি লুইস মেশিন গান আর দশ হাজার রাউন্ড বুলেট দেন।  সেইসঙ্গে স্থানীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীকেও সাহায্য করার জন্য বলেন। ১৮৭৪ সালের ‘শিকার আইন’-এর আওতায় ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইমুদের নিরীহ ভেবে মারা নিষিদ্ধ ছিল। তবে ১৯২২ সালের পর ভারমিন প্রজাতি হিসেবে তাদের চিহ্নিত করা হলে তাদেরকে শিকার করা উন্মুক্ত হয়ে যায়।

আর্মিরা প্রথমে বন্দুক হাতে নিয়ে ইমুদের শুশু করে ভয় দেখানোর চেষ্টা করল। তাতে ইমু পাখিদের কিছু গেল এলো না। যখন ভয় দেখিয়ে কাজ হলো না, তখন অস্ট্রেলিয়ান বাহিনী বিভিন্ন জায়গায় মেশিনগান পোস্ট বসিয়ে সরাসরি তাদের উদ্দেশ্যে ফায়ার করা শুরু করল।  প্রায় ১০,০০০ রাউন্ড গুলি বর্ষণ শেষে যখন যুদ্ধের ময়দানের ধোঁয়া সরে গেল, তখন দেখা গেল মাত্র নয়টা ইমু পাখি মরে পড়ে আছে সেখানে। বাকিরা উধাও। পরে সারা দিনে আরো মোটামুটি ৮০-৯০টার মতো পাখি মারতে সক্ষম হয়েছিল তারা। যখনই কোনো ঝাঁকের উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়া হচ্ছিল, দেখা যাচ্ছিল ঝাঁক ভেঙে তারা আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে। লুকিয়ে পড়ছে গাছের আড়ালে এবং জঙ্গলের ভিতর ঝোপে-ঝাড়ে। গুলি খুব সামান্য লাগছে তাদের গায়ে। কিছুদিন পর অস্ট্রেলিয়ানদের সামনে একটা বড় সুযোগ চলে এলো। প্রায় ১০০০ সদস্যের একটা ইমু পাখির দল তাদের নজরে এলো। অনেকক্ষণ ফায়ারিংয়ের পর গুনে দেখা গেল মাত্র ডজনখানেক ইমু পাখি মরেছে। বাকিরা যথারীতি জঙ্গলের দিকে পালিয়ে গেছে। এই যুদ্ধের সময় ইমু পাখিদের একটা বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেল। দেখা গেল, এরা প্রকৃতিগতভাবেই রীতিমত কমান্ডো ট্রেনিংপ্রাপ্ত! সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছিল ১৯৩২ সালের ৮ নভেম্বরের যুদ্ধে। সেদিন প্রায় ২৫০০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল ইমুদের ঝাঁকের ওপর। মারা পড়েছিল প্রায় ২০০ থেকে ৫০০টা ইমু। ৮ নভেম্বর পর্যন্ত হাউজ অফ রিপ্রেজেনটিটিভ কৃষকদের পক্ষে থাকলেও এরপর তারা এটা নিয়ে সমালোচনা শুরু করে। তাছাড়া পত্র-পত্রিকাতেও এর বিরুদ্ধে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হতে থাকে। শেষপর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ান আর্মিদের যোগ্যতা আরো প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আগেই নভেম্বরের শেষদিকে এ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষিত হয়। অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের ভূখণ্ডে স্বাধীনতা লাভ করল ইমু পাখিরা।

মেজর মেরেডিথ তাঁর জমা দেওয়া রিপোর্টে উল্লেখ করেছিলেন, ‘যদি এই পাখিরা বুলেট বহন করতে পারত এবং তাদের দিয়ে আমাদের বাহিনীতে একটা আলাদা ডিভিশন গঠন করা হতো, তবে সেই ডিভিশন বিশ্বের যে কোনো বাহিনীর মোকাবিলা করতে পারত।’

না, ঘটনা এখানেই শেষ হয়নি। যুদ্ধের পরপর ইমু পাখিদের অত্যাচার আরো বেড়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে মিলিটারি সহায়তা দেওয়া হলেও তাদের থামানো যায়নি। এই যুদ্ধের পর আরো দশ বছর পর্যন্ত ইমুদের এই তাণ্ডব সহ্য করতে হয়েছিল সে অঞ্চলের বাসিন্দাদের। শেষমেষ বিশেষ এক রকম বেড়া ব্যবহার করে কৃষকেরা তাঁদের ফসল রক্ষা করতে সক্ষম হন।

এইচ এম নাজমুল আলম