প্যালেস্টাইনের বন্ধু বঙ্গবন্ধু ও ‘জুলিও কুরি’

আপডেট : ২২ মে ২০২১, ২১:৫৭

করোনা মহামারির মাঝে বিশ্বব্যাপী মুসলমানের সঙ্গে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দে শামিল হবে প্রস্তুতি চলছিল প্যালেস্টাইনেও। ঈদ মানে আনন্দ। শিশুরাই তো উত্সবের আনন্দ অনুভব করতে পারে সবচেয়ে বেশি। প্যালেস্টাইনেরও শিশুরাও তো তেমনি। অথচ এই শিশুদের ভাগ্যে এবারের ঈদ কী আনন্দ নিয়ে এলো?

ঈদুল ফিতর পালিত হয়েছে বিশ্বজুড়ে, প্যালেস্টাইনে শিশুর শরীর ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়েছে বোমার আঘাতে। ইসরায়েল বলেছিল, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামাস যেহেতু যেখানে ইহুদি পাবে, সেখানেই হত্যা করবে বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়, সেহেতু এই আক্রমণ না করে উপায় ছিল না।

ইসরায়েলের বর্বরতাকে বরাবরের মতো সমর্থন দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ন্যুয়র্ক টাইমস ও আমেরিকান মিডিয়া লিখছে ও বলছে—‘প্যালেস্টাইনিরা নিহত হয়েছে’ এবং ‘ইসরাইলিদের হত্যা করা হচ্ছে’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বক্তব্য দিয়েছেন এই বলে যে, ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে। নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেই অধিকারে প্যালেস্টাইনের ছোড়া ইট-পাটকেলের জবাবে বোমা হতে পারে না।

আমরা জানি, সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কেও ঢাক ঢাক গুড় গুড় আছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গোপনে জেট বিমান করে সৌদি গিয়ে যুবরাজ সালমানের সঙ্গে দেখা করার খবরও দেখেছি গত বছর। সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ ও ইরান প্রশ্নে একসঙ্গে মিলে কী কী শায়েস্তামূলক কৌশল গ্রহণ করা যায়, তা নিয়ে কথা হয়েছে বলে স্বীকার করেছিল ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ। ইরানকে ঠেকাতে গিয়ে কে কার চেয়ে বড় ইসরায়েলের বন্ধু হবে, সেই প্রতিযোগিতায় নামা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো একবারও ভাবছে না, এই প্যালেস্টাইনের সীমানা একসময় ইসরায়েল আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।

আল-আকসা মসজিদ এলাকায় ইসরায়েলের আগ্রাসী হামলার নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্যালেস্টাইনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে লেখা এক চিঠিতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ প্যালেস্টাইনের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের পাশে থাকবে বলেছেন। পত্রিকা মারফত জেনেছি, প্যালেস্টাইনে একটি বাড়ির নাম সেখানকার মানুষ ভালোবেসে রেখেছে ‘শেখ হাসিনা’। পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন প্রধানমন্ত্রীর চিঠি প্যালেস্টাইনের রাষ্ট্রদূতকে হস্তান্তর করার সময় ঢাকায় নিযুক্ত প্যালেস্টাইনের রাষ্ট্রদূত ইউসেফ এস ওয়াই এই তথ্য জানান। আরো আগে খবর পেয়েছিলাম, প্যালেস্টাইনের হেবরন শহরের একটি সড়কের নাম রাখা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নামে। এই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ইতিহাস বাংলাদেশ ও প্যালেস্টাইনের জনগণ সেই ১৯৭১ সাল থেকে বহন করছে।

কেবল মুসলিম বলে নয়, মানুষ হিসেবে মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতিতে ভরসা করি আসলে। এই সংস্কৃতি বাঙালির সংস্কৃতি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ এটাই। শান্তি, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই আদর্শের স্বীকৃতি হিসেবে ভূষিত হয়েছিলেন ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদকে। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির প্রায় এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো পেয়েছিল আন্তর্জাতিক সম্মান। ১৯৭৩ সালের ২৩ মে বিশ্ব শান্তি পরিষদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদক তুলে দেয়। বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্তির ৪৮তম বার্ষিকী উদ্যাপনের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্মরণ করছি তাঁর আদর্শকে। শান্তি, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে থাকা মহাকালের সেই তর্জনী বিশ্বব্যাপী শোষিত-নিপীড়িতের পক্ষে কথা বলেছে, সাহস জুগিয়েছে। এ বছরের ২৩ মে মনে করিয়ে দিচ্ছে শোষিত-নিপীড়িত প্যালেস্টাইনের জনগণের পরম বন্ধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠ এখনো কতটা প্রাসঙ্গিক।

বিশ্ব শান্তির সংগ্রামে বিশ্ববিখ্যাত দুই পদার্থবিজ্ঞানী মেরি কুরি ও পিয়েরে কুরি-র অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে বিশ্ব শান্তি পরিষদ ১৯৫০ সাল থেকে তাঁদের নামে এই শান্তি পদক প্রবর্তন করে। ফ্যাসিবাদবিরোধী, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে ও মানবতার কল্যাণে শান্তির সপক্ষে বিশেষ অবদানের জন্য ব্যক্তি ও সংগঠনকে ‘জুলিও কুরি’ পদক প্রদান করা হয়। কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, ভিয়েতনামের হো চি মিন, প্যালেস্টাইনের ইয়াসির আরাফাত, চিলির সালভেদর আলেন্দে, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, ভারতের ইন্দিরা গান্ধী, মাদার  তেরেসা, চিলির কবি ও রাজনীতিবিদ পাবলো নেরুদা, ভারতের জওহরলাল নেহেরু, আমেরিকার মার্টিন লুথার কিং, রশিয়ার (সোভিয়েত ইউনিয়ন) লিওনিদ ব্রেজনেভ প্রমুখ বিশ্বনেতাদের এই পদকে ভূষিত করা হয়েছে।

পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল আগ্রাসী নীতির বিপরীতে বঙ্গবন্ধু সরকার ঘোষিত জোট নিরপেক্ষ নীতি এই পুরস্কার অর্জনের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছিল। সদ্য স্বাধীন দেশ হয়েও বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারোর সঙ্গে বৈরিতা নয়—এই নীতি গ্রহণ করেছিল শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে থাকা বঙ্গবন্ধুর জোরালো মনোভাবের কারণে। সবার প্রতি বন্ধুত্বের ভিত্তিতে গ্রহণ করা বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির সাফল্য এখন বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা  প্রমাণ করে।

জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর বৃহত্তম শক্তি যে অর্থ ব্যয় করে মানুষ মারার অস্ত্র তৈরি করছে, সেই অর্থ গরিব দেশগুলোকে সাহায্য দিয়ে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে।’ কপট শান্তির বুলি আওড়ানো শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভূমিকা এখনো এর  বিপরীত মেরুতে। মানুষ বাঁচানোর চেষ্টা বাদ দিয়ে মানুষ মারার অস্ত্র তৈরিতে ব্যয় করা হচ্ছে অস্ত্র। ঠিক একইরকম মনোভাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান করছেন  কোভিড-নাইন্টিন সৃষ্ট মহামারি ঠেকাতে সবার জন্য টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে। বাস্তবে আমরা কী দেখছি? সব দেশ এখনো সেই টিকা পায়নি। টিকা-বাণিজ্য, টিকা-রাজনীতির শিকার হচ্ছে মানুষ।

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় প্রথমবার ভাষণ দিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই ভাষণেও তিনি প্যালেস্টাইনের জনগণের সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘অবৈধ দখলকৃত ভূখণ্ড পুরোপুরি মুক্ত করার জন্য আমাদের আরবভাইদের সংগ্রাম অব্যাহত রহিয়াছে এবং প্যালেস্টাইনি জনগণের বৈধ জাতীয় অধিকার এখনো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয় নাই।’ প্রশ্ন হলো, প্যালেস্টাইনি জনগণের বৈধ জাতীয় অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা কবে সম্ভব হবে?

প্যালেস্টাইনের শিশুদের জন্য স্বাধীন নিরাপদ প্যালেস্টাইনের কামনায় পিএলও আর হামাস নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ভুলে বঙ্গবন্ধুর মতো কালজয়ী নেতৃত্বের ছায়াতলে স্বাধীন দেশের স্বপ্নে ঐক্যবদ্ধ করে তুলুক জনগণকে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদকপ্রাপ্তির ৪৮তম বার্ষিকীতে এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

n লেখক : কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার