লাখ লাখ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে দিনের বেশির ভাগ সময়। সেই সময়টাতে কিছু সংখ্যক কাটাচ্ছে বিনোদনে আবার ঠিক একই অবস্থানে থেকে সেই সময় ব্যয় করে কেউ কেউ লাভ করছে হাজার হাজার ডলার। ফ্রিল্যান্সিং শব্দটা ইংরেজি হলেও এর নিহিতার্থ হলো কোনো প্রতিষ্ঠানের অধীনে না থেকে নিজের দক্ষতার মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে সেবা প্রদান করা। সোজা বাংলায় যেটাকে মুক্ত আয়ের পেশা বলে।
বর্তমান যুগ চতুর্থ শিল্পবিপ্লব তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল মাধ্যমের উদ্ভাবনের ফলে কমিয়ে দিয়েছে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা, সুযোগ করে দিয়েছে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা। দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি ছোট্ট যান্ত্রিক মাধ্যম তথা মোবাইল ফোনের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে দিনের ২৪ ঘণ্টার যে কোনো সময় নিজের আর্থিক অবস্থানটা চাইলে পূর্বের তুলনায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে নেই কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চাপ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর সর্বশেষ তথ্যমতে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ ছাড়িয়েছে যা শতকরা ৪.২ শতাংশ। অন্যদিকে, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৪ কোটি ৪০ লাখ তরুণের প্রতি ১০ জনের একজন বেকার। বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থার দিকে থাকালে দেখা যাবে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী পাশ করে বের হচ্ছে কিন্তু মানসম্পন্ন কোনো চাকরি মিলছে না। গত বছর-দেড়েকে করোনা মহামারিতে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আন্তর্জাতিক নির্ভরশীলতা অর্জন ও নিজের দক্ষতা বিচরণের মাধ্যমে আর্থিক দিক দিয়ে স্বাবলম্বী হতে বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজের স্তরগুলোর মধ্যে ফটোগ্রাফি, অ্যানিমেশন, লোগো ডিজাইন, ইলাস্ট্রেশন, গ্রাফিক্স ডিজাইন, কনটেন্ট রাইটিং, অডিও এবং ভিডিও প্রোডাকশন, ডাটা এন্ট্রি, ওয়েব রিসার্চ, ওয়েব ডিজাইনিং এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ট্রান্সলেশন ইত্যাদি জনপ্রিয়। তন্মধ্যে যে কোনো একটিতে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে ঘরে বসে হাজার হাজার ডলার আয় করা সম্ভব। এখানে বিনিয়োগের প্রশ্ন না থাকায় সব শ্রেণির জন্য রয়েছে অঢেল সুযোগ, যেখানে নেই কোনো বসের চাপ কিংবা দৌড়াদৌড়ি করে অফিসে যাওয়ার ঝামেলা। যেখানে রয়েছে সময়ের স্বাধীনতার পাশাপাশি বিনোদনের সুযোগ।
দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে গত ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে, যার ফলে লাখ লাখ মানুষ যেমন ঘরবন্দি হয়েছে ঠিক তেমনি হারিয়েছে চাকরিটাও, বন্ধ রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই ফাঁকে অনেকে মহামারিকে অজুহাত না দেখিয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় অনলাইনের মাধ্যমে স্বল্প মেয়াদি কোর্স করে নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি ঘরে বসে আয় করছে হাজার হাজার ডলার। যেখানে ২০ বছর পড়ালেখা সম্পন্ন করেও মানসম্পন্ন কোনো চাকরি মেলে না সেখানে অল্প সময়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে অন্যান্য কাজের পাশাপাশি অনলাইন থেকে আয় করছে হাজার হাজার ডলার। যার কারণে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ মানুষ ফ্রিল্যান্সিং তথা মুক্ত পেশায় প্রবেশ করেছে এবং দিন দিন আইটি সেক্টরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের অর্থনীতির পাশাপাশি বেকারত্ব নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ৬ লাখ ৫০ হাজার নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সার আছে তন্মধ্যে ৫ লাখেরও অধিক নিয়মিত কাজ করছে। আইসিটি ডিভিশনের তথ্যানুযায়ী তারা বার্ষিক ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু-বিভাগীয় গবেষণা ও শিক্ষাদান বিভাগ অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট (ওআইআই) এর জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং তথা আউটসোর্সিং সেবায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, প্রথমে অবস্থান করছে ভারত।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন উন্নত দেশসমূহের আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহ শীর্ষস্থানে রয়েছে। লক্ষাধিক ফ্রিল্যান্সাররা বিভিন্ন মার্কেট প্লেস যেমন :আপওয়ার্ক, ফাইবার, ফ্রিল্যান্সার ডট কম, পিপল পার আওয়ার, নাইনটি নাইন ডিজাইনস, গুরু ডটকম ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে ক্লায়েন্টের সঙ্গে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণের মাধ্যমে হাজার ডলার আয় করছে ও দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বর্তমান সরকার তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করতে বিপিও এজেন্সি থেকে ২০২৪ সাল নাগাদ কর মওকুফ করেছে সঙ্গে আইসিটি মন্ত্রণালয় আইনি চ্যানেলের মাধ্যমে যেসব এজেন্সি অর্থ আনছে তাদের জন্য ১০ শতাংশ প্রণোদনা প্রদান শুরু করেছে। যেটার ফলশ্রুতিতে দেশ একদিকে যেমন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে সঙ্গে দেশের এক বিরাট জনগোষ্ঠী জনশক্তিতে রূপান্তর হবে। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত ও তারুণ্যের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে আইসিটি বিভাগের অধীনে শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের দক্ষতা অর্জনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিশ্বে নিজের অবস্থান নির্ধারণ ও সময়ের সঠিক মূল্যায়নের জন্য দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মুক্ত পেশা তথা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে চাহিদাটা পূরণের সম্ভাবনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ তথা স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে অনলাইন যোদ্ধারা ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। মুক্তপেশার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা পালন করবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
