বঙ্গবন্ধু বিশ্বশান্তির স্বাপ্নিক ও রূপকার ছিলেন। তাকে অনুসরণ করে শান্তির যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তা হলো মানুষের শোষণমুক্তি, তার মানবিক উন্নয়ন ও সারা বিশ্বে সম্প্রীতিময় পরিবেশ। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনুঘটক হয়ে বাঙালির শোষণমুক্তির মাধ্যমে শান্তির প্রাথমিক রূপায়ণ করেছিলেন। তারপর শুরু হয়েছিল বাঙালির অভ্যন্তরীণ শোষণমুক্তির চূড়ান্ত সংগ্রাম, যা অসমাপ্ত রেখে তার অসমাপ্ত জীবনের ইতি ঘটেছিল। দক্ষিণ এশিয়াসহ বৈশ্বিক শান্তির জোরালো প্রবক্তা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এ সবের স্বীকৃতি জুলিও কুরি শান্তি পদক, যা ছিল তার ও বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন। বিশ্বশান্তি পরিষদ সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিকে এভাবে সম্মানিত করে আসলেই দেশটিকে মহিমান্বিত করেছিল। অন্য কথায় বঙ্গবন্ধু তার ব্যক্তিগত অর্জন দিয়ে গৌরবান্বিত করেছিলেন তার দেশকে।
১৯৭৩-এর ২৩ মে ঢাকায় বিশ্বশান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে এ পদকে ভূষিত করে। অবশ্য বিশ্বশান্তি পরিষদ ১৯৭২-এর ১০ অক্টোবর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৪০ দেশের প্রতিনিধির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। এ পদক প্রাপ্ত অন্যরা ছিলেন সালভাদর অ্যালেন্দে, হো চি মিন, নেলসন ম্যান্ডেলা, ড. মার্টিন লুথার কিং, লিওনিদ ব্রঞ্জনেভ, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, মাদার তেরেসা, ফিদেল ক্যাস্ত্রো প্রমুখ। বিশ্বশান্তি পরিষদের মহাসচিব রমেশ চন্দ্র পদক প্রদান ভাষণে বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববন্ধু হিসেবেও অভিহিত করেছিলেন। এমন অভিধার উচ্চারণ এই প্রথম; যা এখন বহুশ্রুত।
পদক গ্রহণ করার সময়ে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক ও দিকনির্দেশক বক্তব্য ছিল, যার দুটো বিশেষভাবে উল্লেখ্য। এক. ‘...আমি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে চাই, বিশ্বশান্তি আমার জীবনদর্শনের মূলনীতি।’ দুই. ‘বাংলাদেশের মানুষের কাছে শান্তি আর স্বাধীনতা একাকার হয়ে মিশে আছে। আমরা মর্মে মর্মে অনুধাবন করি বিশ্বশান্তি আর আঞ্চলিক শান্তির অপরিহার্যতা।’
বঙ্গবন্ধুর শান্তি অন্বেষার দীর্ঘ পটভূমি আছে। ১৯৫২-তে মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি ২-১২ অক্টোবর পিকিং ৩৭ জাতি সম্মেলনে যান পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে। তার বই আমার দেখা নয়াচীন (২০২০)-এ শান্তি সম্মেলন সম্পর্কে লিখেছেন, ‘রাশিয়া হউক, আমেরিকা হউক, ব্রিটেন হউক, চীন হউক যে-ই শান্তির জন্য সংগ্রাম করবে, তাদের সাথে আমরা সহস্র কণ্ঠে আওয়াজ তুলতে রাজি আছি, ‘আমরা শান্তি চাই।’ (পৃ-১১৯)।
বঙ্গবন্ধু ১৯৫৬ সালে স্টকহোম শান্তি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এ সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
বঙ্গবন্ধুর শান্তি-স্বপ্ন এবং অন্বেষা বিধৃত হয়ে আছে সংবিধানে, যা প্রণীত বা বাস্তবায়িত হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২; অর্থাত্ জুলিও কুরি পদক পাওয়ার আগে। ২৫ নম্বর ধারার শিরোনাম ‘আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতির উন্নয়ন।’
১৯৭৩-এ আলজিয়ার্স জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু সারা বিশ্বের তাক লাগানো মন্তব্য করলেন, ‘বিশ্ব আজ দুভাগে বিভক্ত—শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’
আমাদের পররাষ্ট্রনীতির শান্তিবাদী চরিত্রও নির্ধারণ করে দিয়ে তিনি নির্দেশ দিলেন, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বৈরিতা নয়’; যা আজও আমাদের পররাষ্ট্রনীতি বা কূটনীতির মূলমন্ত্র।
শান্তি বঙ্গবন্ধুর চেতনায় ছিল, যার রূপায়ণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে পাটাতন হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
লেখক : চেয়ার অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চেয়ার, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইপি)
