ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক বলেছেন, ভারতে লকডাউন শিথিল হলে করোনার ভারতীয় ধরন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ সতর্কবার্তা শুধু ভারতের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য। বাংলাদেশে একদিকে যেমন সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমছে, অন্যদিকে কোথাও কোথাও ভারতীয় ভ্যারিয়্যান্ট পাওয়া যাচ্ছে। ঈদকে ঘিরে লাখ লাখ মানুষের অবাধ যাতায়াত গোটা বাংলাদেশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহ বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি খুবই শঙ্কাপূর্ণ। যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই সরকারের পাশাপাশি সবাইকে নিজেদের স্বার্থে সম্মিলিতভাবে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা আছে, করোনার ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত, আসতে পারে নতুন কোনো ভাইরাস বা মহামারি। বাংলাদেশের গত ১৪ মাসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মহামারি প্রতিরোধে দীর্ঘস্থায়ী প্রস্তুতি এবং বাংলাদেশি মডেল তৈরি করতে হবে। সবাইকে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ, সে অনুযায়ী প্রত্যাশা হতে হবে বাস্তবধর্মী। জীবন-জীবিকা-অর্থনীতি রক্ষার স্বার্থে গ্রহণ করতে হবে বাস্তবায়নযোগ্য কার্যকর পরিকল্পনা।
ঈদের ছুটির পর করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৈনিক শনাক্তের সংখ্যাও বাড়ছে। মৃত্যুও আগের দিনের তুলনায় বেড়েছে। দেশে এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের চারটি ধরন বা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে ইউকে ধরন (বি.১.১.৭), দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন (বি.১.৩৫১), নাইজেরিয়ার ধরন (বি.১.৫২৫) ও ভারতীয় ধরন (বি.১.৬১৭.২)। সম্প্রতি জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর), আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এবং ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভস (আইদেশি) যৌথভাবে কোভিড-১৯-এর প্রায় ২০০ নমুনা সিকোয়েন্সিং করেছে। সেই গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্বে বর্তমানে করোনা সংক্রমণের কেন্দ্র ভারত। ভারতে সংক্রমণ বিস্ফোরণের জন্য করোনার ভারতীয় ধরনকে অনেকাংশে দায়ী করা হচ্ছে। করোনার ভারতীয় ধরনকে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মধ্যে আছে। এ পরিস্থিতি রক্ষা করে নিম্নমুখী হওয়ার জন্য জরুরিভাবে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গোটা বিশ্বই হিমশিম খাচ্ছে, বিশেষ করে শক্তিধর দেশগুলো ধরাশায়ী হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃতে সরকার সময়োচিত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিচ্ছে। সেখানে সরকারের পাশাপাশি দেশের সর্বস্তরের জনগণকে সহযোগিতার হাত না বাড়িয়ে দিলে বাস্তবায়ন খুবই কঠিন।
এখনকার সবচাইতে উদ্বেগের বিষয় হলো পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে কোটি মানুষ বাড়ি গিয়েছে এবং তারা আবার ফিরতে শুরু করেছে। যেভাবে যাতায়াত হয়েছে, তাতে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা আছে, এর জন্য কোনো বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। ঈদে মানুষ বাড়ি যাবে, যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাহলে স্বাস্থ্যবিধি মানিয়ে বাড়ি পাঠানো ভালো হতো। এ ব্যাপারে যারা বাস্তবায়নে আছেন, তারা বাস্তব অভিজ্ঞতা এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। তাই যারা মহানগরে ফিরবেন, তাদের কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানিয়ে ফেরত আনা যায়, সেই ব্যবস্থা জরুরিভাবে গ্রহণ করতে হবে। দুই মাস পর আবার আসবে কোরবানির ইদ। সে সময় পশু যাতায়াতসহ আরো নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হবে, সেই ভাবনাগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। এ লক্ষ্যে আমার কিছু প্রস্তাব রয়েছে :ক. ট্রেন, দূরপাল্লার পরিবহন ও লঞ্চে তুলনামূলকভাবে অনেক ভালোভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানিয়ে এদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব, যদি সংশ্লিষ্ট সবাই সহযোগিতা করেন। খ. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের নেতৃতে স্বেছাসেবক, স্কাউট, সংশ্লিষ্ট সমিতির সমন্বয়ে স্টেশন, ঘাট সর্বত্র স্কোয়াড বানিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গ. স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তৃণমূলে রয়েছে ভালো নেটওয়ার্ক। ঘরে ফেরা মানুষের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে এবং অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে চিকিত্সা প্রশাসনকে আরো তত্পর হতে হবে। ঘ. ঈদে মানুষের যাতায়াতব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে হতে হবে, যাতে একবারে সব চাপ বা ভিড় না হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, ঈদে সব মানুষই উত্সব করতে যায় না, নিম্ন আয়ের মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ, ভাসমান মানুষ বছরে দুবার বাড়ি যায় পিতামাতা, স্ত্রী-সন্তানের কাছে একটু শান্তির জন্য, কঠিন নাগরিক জীবন থেকে একটু মুক্তির জন্য। এজন্য তারা জীবনের ঝুঁকি নিতে দ্বিধাবোধ করে না।
বিগত ১৬ মাসের অভিজ্ঞতায় এটা প্রমাণিত যে, করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ রাখার রক্ষাকবচ হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি। সর্বত্র এটা বাস্তবায়নের জন্য নিয়ন্ত্রণ ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদের যুক্ত করতে হবে। অন্যদিকে করোনা ভাইরাস আমদানি করা ভাইরাস। অন্য দেশ থেকে আমদের দেশে এসেছে। ইতালি থেকে এক বিমানে ৩৫১ জন যাত্রী এসে গোটা বাংলাদেশ ছড়িয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে বিদেশফেরত মানুষের বিষয়ে যথেষ্ট ব্যবস্থা নিয়েছে সব বন্দরে, বিশেষ করে ভারতীয় সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপের জন্য বাংলাদেশ এখনো অনেকটা নিরাপদ আছে। প্রয়োজনে আরো কঠোর হতে হবে।
জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে জনগণকে যুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক শক্তি, বেসরকারি সংস্থা, তরুণ ছাত্রসমাজকে আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান করে দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। করোনা প্রতিরোধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ভ্যাকসিনের সংকট দূর করতে হবে। এই সংকট বিশ্বব্যাপী। এখনো উন্নত দেশসহ প্রায় ১০০ দেশ কোনো ভ্যাকসিন পায়নি। আমদের সাময়িক সংকট দ্বিতীয় ডোজের জন্য অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ঘাটতি ১৪ লাখ ডোজ। আমরা আশাবাদী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ব্যবস্থা সময়মতো করে ফেলবেন। আপত্কালীন সংকট মোকাবিলায় রাশিয়া ও চীন থেকে ১ কোটি ডোজ করোনা ভাইরাস প্রতিষেধক টিকা কিনবে সরকার। তবে দেশেই টিকা উত্পাদনের দিকে সরকারের মনোযোগ। এটিকে ঘিরেই মূল পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি এবং চীনের সিনোফার্মের টিকা দেশি ওষুধ কোম্পানির মাধ্যমে উত্পাদন করা হবে। এর মাধ্যমে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি যৌথ ব্যবস্থাপনায় রপ্তানিরও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ নিয়ে দেশ দুটির সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। দ্রুতই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করা যায়।
অনেক দেশ আছে, যারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাদের জীবিকা চালু রেখেছে। যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং। এসব দেশে লকডাউন দিতে হয়নি। আমাদের দেশেও যথাসম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে যতটা জীবিকা চালু রাখা যায় ততই মঙ্গল। এখন যেমন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি এবং অন্যান্য মিলকারখানা চলছে। জীবিকার সঙ্গে জীবন-অর্থনীতি উভয়ই যুক্ত। সেক্ষেত্রে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে হবে। বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা যায়। যেহেতু এ পরিস্থিতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একা সামাল দিতে পারবে না, তাই আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয় জরুরি। সমন্বয়টা রক্ষা করার দায়িত্ব প্রধানত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। এর আগে অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এ ধারা যেন কঠোর নজরদারির মাধ্যমে অব্যাহত থাকে। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব মন্ত্রণালয়-অধিদপ্তর কাজ করবে এটাই প্রত্যাশা।
করোনা পরিস্থিতিতে বাস্তবিক কারণে ননকোভিড রোগীদের চিকিত্সা কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ননকোভিড রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। এবং কোথাও যেন কোভিড-ননকোভিড রোগী মিশ্রিত না হয়ে যায়। টেলিমেডিসিনের ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে। চিকিত্সকদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে দীর্ঘ সময় ঘরে থাকার কারণে নানা ধরনের নতুন নতুন রোগ লক্ষ করা যাচ্ছে,বিশেষ করে মানসিক রোগ। এজন্য বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। সব সময় পরিবেশ প্রাণবন্ত রাখতে হবে। ব্যায়াম করতে হবে নিয়মিত। খাবারের সাধারণ নিয়ামাবলি মানতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের ওপর নজর রাখতে হবে, যাতে কোনো ধরনের মানসিক ভারসাম্য না হারায়।
সর্বোপরি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের নির্ধারিত মুখপাত্রই কেবল সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য প্রচার করবে। একেকজনের একেক রকম বক্তব্যে জনগণ বিভ্রান্ত হয়। গণমাধ্যমকে সঠিক তথ্য প্রদান করে হালনাগাদ রাখা সরকারের দায়িত্ব। সরকারের মুখপাত্র, গণমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। সবাইকে মনে রাখতে হবে, গোটা বিশ্বের মানুষ এক নতুন কঠিন সময়ের মুখোমুখি। আমদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। মূলত লকডাউন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। লকডাউন দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। গোটা বিশ্বই অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সেক্ষেত্রে জোনভিত্তিক লকডাউন হতে পারে। লকডাউন প্রত্যাহারও করতে হবে ধাপে ধাপে।
করোনাকে কেন্দ্র করে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ভবিষ্যত্, অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে পৃথিবী। কবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে মানুষ, কেউ বলতে পারে না। তবু এর মধ্যে বেঁচে থাকতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে। বাঙালি জাতি কখনো হার মানেনি। এ লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হলে এবারও হারব না। বাংলাদেশ এখনো অনেক দেশের চাইতে ভালো আছে। এক অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে আমদের প্রিয় দেশকে সুস্থ রাখার স্বার্থে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই।
n লেখক :সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
