প্রকৃতির রূপসী কন্যা আমাদের বাংলাদেশ। এই প্রকৃতি যেমন আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, তেমনি আবার কখনো কখনো এই প্রকৃতিই আমাদের আশ্রয় ধ্বংস করে। প্রকৃতির এই নির্মম রূপটিকে আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নামে নামকরণ করেছি। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুর কারণে আমাদের প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা, ব্যাপকতার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। প্রায় প্রতি বছরই এদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, টর্নেডো, ভূমিকম্প, খরা, নদীভাঙন, শিলাবৃষ্টি প্রভৃতি এদেশের প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও খরা।
১৯৮৮ সালের বন্যা ছিল বাংলাদেশের স্মরণকালের ভয়াবহ। এ বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা বাংলাদেশের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকা, যেমন—বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বেশি আঘাত হানে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৯৬০ ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫০টি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে। এছাড়াও প্রতি বছর ভয়াবহ কালবৈশাখী তো আছেই। ঝড়ের তাবলীলায় গাছপালা, ঘরবাড়ি ভেঙে যায়; মারা যায় হাজার হাজার গরু বাছুর, পাখপাখালি, মানুষ হয়ে পড়ে অসহায়। অনেক সময় ঝড়ের সঙ্গে শুরু হয় বজ্রসহ বৃষ্টিপাত। বজ্রপাতের কারণে এদেশে অনেক লোকের প্রাণহানি ঘটে।
যুগে যুগে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব অত্যন্ত প্রকট। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয় ঠিকই। কিন্তু আমরা চাইলে সে পরিমাণটাকে কমিয়ে আনতে পারি। এক্ষেত্রে দুর্যোগ পূর্বকালীন সতর্কতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী পদক্ষেপ।
আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষ উন্নত জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছে। আজকাল ঝড়-বৃষ্টির আগেই আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়। সতর্কতা জারি করা হয়। কিন্তু অসচেতনতার জন্য বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি জনসাধারণ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। যেহেতু দুর্যোগ হঠাত্ করে আসে, তাই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও বিভিন্ন উপায়ে তা মোকাবিলা করা যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—দুর্যোগ মোকাবিলার পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করা, দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মিবাহিনী গঠন করা। যেমন, রেডক্রিসেন্টসহ আরো সামাজিক সংগঠন রয়েছে—দেশের ক্রান্তিলগ্নে অসামান্য ভূমিকা রাখে। জাতীয় ভিত্তিতে দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য নীতিমালা, পরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন করা। দুর্যোগ মোকাবিলায় সমস্ত সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে। প্রত্যেক এলাকার জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরীক্ষিত দুর্যোগব্যবস্থাকে কাজে লাগানো, সতর্ক সংকেত দেওয়ার ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ ও কার্যকরী করা। দুর্যোগের সময়ের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সুপেয় পানি, প্রাথমিক চিকিত্সা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা। সরকার দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে অসহায় মানুষদের জন্য অর্থসহ বিভিন্ন ত্রাণ সামগ্রী পাঠালেও কিছু অসাধু লোভী মানুষের কারণে সেগুলোর সঠিক বিতরণ নিশ্চিত হয় না। এক্ষেত্রে প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে। বিধ্বস্ত মানুষদের জন্য সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি শিক্ষার মাধ্যমে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
প্রকৃতির বিশালতার কাছে মানুষ অসহায়। মানুষ প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে না পারলেও প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মানুষের সৃষ্ট কর্মকাণ্ডের জন্য প্রকৃতি রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রেহাই পেতে হলে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে সর্বাগ্রে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হচ্ছে। জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করতে প্রচুর পরিমাণ গাছ লাগাতে হবে। পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যেমন—মাটি, পানি, বায়ু ইত্যাদি দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। দুর্যোগ সব সময়ই মানবতার জন্য বিপদ ডেকে আনে। তাই যে কোনো দুর্যোগের সময় আর্তমানবতার সেবায় হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ সরকার অনেক কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। ফলে ভবিষ্যতে আমরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলার সময়োপযোগী প্রস্তুতি গ্রহণে সক্ষম হতে পারব।
n লেখক :শিক্ষার্থী, বরেন্দ্র কলেজ, রাজশাহী
