সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আতঙ্কের নাম টিকটক, লাইকি। বিনোদনের পরিবর্তে যেটি বর্তমানে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতে নিজের ব্যঙ্গাত্মক মুখভঙ্গি কিংবা রোম্যসংলাপের ঠোঁট মেলানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে তরুণ প্রজন্ম। সমাজের একটি বৃহত্ অংশ টিকটক, লাইকির অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
অ্যাপ দুটির জনপ্রিয়তার মূলে রয়েছে সহজলভ্যতা এবং ‘তথাকথিত’ তারকাখ্যাতি লাভের প্রত্যাশা। একটি স্মার্ট ফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই টিকটক, লাইকি ভিডিও করা সম্ভব। শুধু শহর নয় গ্রামেও এর ব্যবহারকারী ছড়িয়ে আছে। টিকটক, লাইকি ভিডিওতে মুনাফা লাভের বিষয়টিও লক্ষণীয়। লাইকিতে লাইভের মাধ্যমে আয় করার সুবিধাও আছে। অনেকেই মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা আয় করে ফেলছে। যার কারণে অসময়ে অর্থপ্রাপ্তির লোভে অনেক তরুণ-তরুণী টিকটকের নেশায় বুদ হয়ে যাচ্ছে।
মানহীন কিংবা অর্থহীন নানান কিছু নিয়ে তৈরি হচ্ছে ভিডিও। ব্যঙ্গাত্মক মুখভঙ্গি, নাটক বা সিনেমা রাজনৈতিক বক্তব্য, ওয়াজ মাহফিল, গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলানো প্রভৃতি নিয়ে ভিডিও নির্মাণ করা হয়; কিন্তু উদ্বেগের বিষয় এই যে, নিছক বিনোদনের জন্য তৈরি হলেও এসব আর বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মনোযোগ আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে ভিডিওতে প্রাধান্য পাচ্ছে যৌনতা, অশ্লীলতা, ট্রল, সহিংসতাসহ নানান রকম কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট। মানহীন এসব কনটেন্টের ফলোয়ার লাখ লাখ। কখনো কখনো কোটি ছাড়িয়ে যায়। পেজে ফলোয়ার বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অনেক সময় দলবদ্ধ হয়ে টিকটক, লাইকি ভিডিও করতে দেখা যায়। তরুণ ও কিশোররা গ্যাংয়ে জড়িয়ে অপরাধমূলক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। হয়ে উঠছে সহিংস। টিকটকের শুটিং চলে রাজধানীর প্রায় সব বিনোদনকেন্দ্রে। বিনোদনকেন্দ্রগুলো যেন টিকটকারদের আস্তানা। বিনোদনকেন্দ্রে ঘুরতে আসা মানুষগুলোকেও তটস্থ থাকতে হয় এসব কিশোরের ভয়ে। আগারগাঁও, চন্দ্রিমা উদ্যান, হাতির ঝিল, দিয়াবাড়িসহ বিভিন্ন জায়গা দখল করে চলে টিকটক আর লাইকির শুটিং। অনেক সময় রাস্তার ফুটপাত দখল করেও শুটিং চলে। শুটিংয়ে কেউ বাধা দিলে এসব টিকটকার তাদের প্রতি হিংস্র হয়ে ওঠে। মারধর, আক্রমণ করে থাকে। শুটিংকে কেন্দ্র করে চলে অবৈধ পুল পার্টি। অনেক সময় এসব শুটিংয়ের মধ্যেই চলতে থাকে অশ্লীলতা। অনেকেই না বুঝে রাতারাতি তারকা বনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যোগ দেয় এসব গ্যাংয়ে। তারকা বানিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয় অনেক তরুণীকে। গ্যাংয়ের কবলে পড়ে মাদকাসক্তিতে আসক্ত হয়ে পড়ে অধিকাংশ তরুণ-তরুণী। এছাড়া বিদেশি অপসংস্কৃতির অনুসরণ করে পোশাক-পরিচ্ছেদ, চুলের রঙে ভিন্নতা এনে এসব ভিডিও তৈরি করছেন। বিব্রতকর এসব ভিডিওর ভিউয়ার লাখ লাখ। এবং এদের অনুসারীরাও এসব সংস্কৃতি অনুসরণ করতে থাকে। শুধু রাজধানী কিংবা শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামেও এর প্রভাব। টিকটক, লাইকি মূলত ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে প্রদর্শন করার মানসিকতার জন্ম দেয়। ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে প্রদর্শন করার মানসিকতা ব্যক্তির মধ্যে আধিপত্যকামী মনোভাবের জন্ম দেয়। যেটি পরবর্তী সময়ে আমাদের সমাজে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বিকৃত অঙ্গভঙ্গি করে যারা ভিডিও তৈরি করছে তাদের মনোযোগের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। শিশু-কিশোররা টিকটক করার ফলে চোখ-মস্তিষ্কসহ শারীরিক নানান ব্যাঘাত ঘটছে। পড়াশোনায় মনোযোগ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সুস্থ মানসিক বিকাশ না থাকাতেই ভয়ংকর পথে পা বাড়াচ্ছে সবাই। প্রযুক্তিবিদদের শঙ্কা— আন্ডারগ্রাউন্ডে এসব প্রযুক্তি বিকাশের ধারাবাহিকতায় আরো খোলস বদলাবে। এমতাবস্থায় দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পেতে রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ব্যক্তিগত সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কঠোর আইনের প্রয়োগ করতে হবে। ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ এসব অ্যাপের ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে এবং সামাজিক অবক্ষয় রোধে টিকটক, লাইকি সরকারিভাবে বন্ধ করে দেওয়া এখনকার সময়ের দাবি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
