অবশেষে কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার রোজিনা ইসলাম। অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মামলায় ছয় দিন হাজতবাসের পর আদালতের দেওয়া জামিনে গতকাল রবিবার বিকালে তিনি কাশিমপুর মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পান। এর আগে সকালে পাসপোর্ট জমাদানের শর্তে এবং ৫ হাজার টাকা মুচলেকায় রোজিনার জামিন মঞ্জুর করেন ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক বাকী বিল্লাহ।
জামিন মঞ্জুরের আদেশের পর উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে বিচারক বলেন, গণমাধ্যম গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল আচরণ করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সুতরাং কোর্ট ও গণমাধ্যম কখনোই একটি আরেকটির জন্য বাধা হিসেবে কাজ করে না, বরং কোর্ট সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে সাংবাদিক রোজিনাকে দায়িত্ব পালনে আরো সতর্ক হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গত ১৭ মে রোজিনা ইসলামকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তা করা হয়। পরে সরকারি নথি ‘চুরি’র অভিযোগে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করা হয় অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে। পরদিন এই মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে পুলিশের রিমান্ড আবেদন বাতিল করে বৃহস্পতিবার জামিন শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়। ঐ দিন উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য গ্রহণ করে বিচারক বাকী বিল্লাহ আদেশের জন্য রবিবার দিন ধার্য রাখেন।
গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পিপি আব্দুল্লাহ আবু শুনানিতে বলেন, ‘এটা স্পর্শকাতর মামলা। যদি আসামি পাসপোর্ট দাখিল করেন, তাহলে তার জামিন দেওয়া যেতে পারে। এতে আমাদের কোনো আপত্তি নাই।’
রোজিনার আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, ‘ঢাকা মহানগর পিপি যে বক্তব্য দিয়েছেন, আইন ও আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আমরা পাসপোর্ট জমা রাখার ক্ষেত্রে কোনো দ্বিমত পোষণ করছি না।’
উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করে বিচারক আদেশে বলেন, ‘মামলার নথিসহ তদন্তকারী কর্মকর্তার দাখিলীয় সিডি ও তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করলাম। আসামি গত ১৭ মে থেকে হাজতে আছেন। সার্বিক ও হাজতবাস বিবেচনায় ৫ হাজার টাকা বন্ডে জামিন মঞ্জুর করা হলো। একই সঙ্গে আসামি জামিন পেয়ে যাতে অন্যত্র চলে যেতে না পারেন, সে জন্য তাকে তার পাসপোর্ট আদালতে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হলো।’ এছাড়া আদালত রোজিনার দুটি মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা নিতে গোয়েন্দা পুলিশকে অনুমতি দেয়।
আদালতের এই আদেশের পর দুপুরে তার পাসপোর্ট আদালতে দাখিল করা হয়। এরপরই জামিন মঞ্জুরের আদেশে স্বাক্ষর করেন বিচারক। পরে ঐ জামিনাদেশ প্রথমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং সেখান থেকে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর বিকাল সোয়া ৪টায় মুক্তি পান রোজিনা। এ সময় তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হয়। তখন তার সঙ্গে পরিবারের ১০-১২ জন সদস্য ও স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় রোজিনা বলেন, ‘সাংবাদিকতা চালিয়ে যাব। পাশে থাকার জন্য আমি দেশবাসী ও সাংবাদিক সমাজের প্রতি কৃতজ্ঞ। সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
এদিকে কারামুক্তির পর রোজিনাকে সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাতে রোজিনার বোন সাবিনা পারভেজ বলেন, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলছে। রোজিনার স্বামী মনিরুল ইসলাম বলেন, সিটি স্ক্যানসহ তার অন্যান্য পরীক্ষা করানো হচ্ছে।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, বিকেল সোয়া ৪টার দিকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে মাইক্রোবাসযোগে কারাগারের প্রধান ফটক দিয়ে বের হয়ে আসেন রোজিনা। তিনি মাইক্রোবাসের সামনের আসনে বসা ছিলেন। পেছনে তার বোনসহ স্বজনেরা ছিলেন। পরে সাংবাদিকদের ভিড় ঠেলে মাইক্রোবাসটি ঢাকার দিকে চলে যায়।
