যে যুদ্ধের শেষ নেই

আপডেট : ২৪ মে ২০২১, ০৭:৫৯

ফিলিস্তিন ভূখণ্ড গাজা ও ইসরায়েল এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শীর্ষ খবর। অস্ত্রবিরতি হলেও সংকট কাটছে না এখনই। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ফিলিস্তিনিদেরই বেশি। যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বারংবার আহ্বান সত্ত্বেও বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। অন্যদিকে হাল ছাড়তে রাজি নয় হামাসও। মনে হয় না সহসা সেখানে শান্তি আসবে। যদিও ২১ মে ভোররাতে উভয়পক্ষের মধ্যে অস্ত্রবিরতি বলবত্ হয়েছে, তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি সংঘাত।

ঘটনার শুরু জেরুজালেমের শহরতলি এলাকা শেখ জাররাহ থেকে কয়েকটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে। বিষয়টি শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, এর মূল অনেক গভীরে। ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি উভয় কম্যুনিটি যুগ যুগ ধরে একে অন্যের পরিচয়কে অস্বীকার করে আসছে। বাস্তুচ্যুত হওয়ায় ফিলিস্তিনিরাই মূলত ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। ২০১৪ সালে ঘটে যাওয়া গাজা হামলার প্রেক্ষাপটও ছিল অনেকটা সেরকম। এ কারণে অনেকের মধ্যে এ ধারণা প্রবল হয়েছে যে, এই লড়াই খুব সহজে শেষ হবে না। সম্প্রতি কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে ইসরায়েল। এর মধ্যে ২০২০ সালের আগস্টে আরব আমিরাতের সঙ্গে হওয়া আব্রাহাম অ্যাকর্ডের কথা উল্লেখ্যযোগ্য। এই চুক্তি ফিলিস্তিন সমস্যাকে একটি স্থানীয় ইস্যুতে নামিয়ে দিয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ আঞ্চলিক পর্যায়ে আরো একঘরে হয়ে পড়ে। প্রতিবেশীদের মধ্যে তাদের মিত্রের সংখ্যা কমে আসে।

বিশ্লেষকদের মতে, আরব-ইসরায়েল সমস্যার মূলে আছে পরস্পরের অস্তিত্ব মেনে না নেওয়া। ভূমির অধিকার, নিরাপত্তা ও কূটনীতির মতো বিষয়গুলো পরে আসে। এজন্য নিয়মিত বিরতিতে দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই শুরু হয়, থেমেও যায় একটা সময় পর; কিন্তু পরস্পরকে মেনে নেওয়ার মতো অবস্থায় আসে না কোনো পক্ষ। বলা অনাবশ্যক ফিলিস্তিনিরা শরণার্থী হিসেবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার করছে। তারা প্রায় সব ধরনের অধিকার বঞ্চিত। ফিলিস্তিনি জনগণের একাংশের প্রতিনিধিত্বকারী হামাসকে সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ একঘরে করে রেখেছে। তারা একদিকে নিজভূমে পরবাসী, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও বিচ্ছিন্ন। তাই অধিকারবঞ্চিতদের পক্ষে অধিকার হরণকারীদের মেনে নেওয়া কঠিন; কিন্তু বাস্তবতা উভয়ের কেউ এখন একপক্ষ অন্যপক্ষকে ঐ জায়গা থেকে পুরোপুরি উত্খাত করতে পারবে না। ৭৩ বছরের ইতিহাস সে কথাই বলে।

এবারের লড়াই শুধু যে গাজা আর ইসরায়েলের অল্প কিছু জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়। সংঘাত ছড়িয়ে গেছে ইসরায়েলের ভেতরেও। সেখানে ইহুদি ও আরবদের সংঘর্ষে লিপ্ত হতে দেখা যায়। ইসরায়েলের শহর লদে একটি ব্যস্ত সড়কে সেদেশের আরব নাগরিকদের গাড়ি লক্ষ্য করে ইহুদির পাথর ছুঁড়তে দেখা গেছে। এই আরবরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি একাত্মতা জানিয়েছিল। এর আগে সেখানে আরবদের হাতে এক বন্দুকধারী ইহুদি নিহত হয়। ইসরায়েলের আরব নাগরিকরা ফিলিস্তিনের পতাকা উত্তোলন করে এবং ইহুদিদের একটি উপাসনালয়ে হামলা করে। লদ ছাড়া ইসরায়েলের রামলে, আক্রে, নাজারেথ, হাইফা ও বন্দরনগরী জাফা থেকেও আরব ও ইহুদিদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর এসেছে। এর মধ্যে লদে সংঘর্ষ ছিল সবচেয়ে তীব্র। যে কারণে পার্শ্ববর্তী পশ্চিমতীর থেকে পুলিশ এনে সেখানে মোতায়েন করতে হয়।

৭৩ বছরের দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ইতিহাস থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি একে অন্যের কমিউনিটির মধ্যে অঙ্গীভূত হবে না। তারা একে অন্যের পরিচয় যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করুক না কেন, সেটি সফল হয়নি। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে থেকে যেসব আরব বা ফিলিস্তিনি সেই ভূখণ্ডে ছিল তারা এখন ইসরাইলি আরব নামে পরিচিতি পাচ্ছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পশ্চিম তীর ও গাজায় বসবাসকারীদের সঙ্গে তারা নিজেদের একাত্ম মনে করে। তাই জেরুজালেমকে জোর করে রাজধানী বানানো তারা মেনে নিতে পারে না। ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে যে রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখে তার সঙ্গে ইসরায়েলি আরবদের দৃষ্টিভঙ্গীতে কোনো পার্থক্য নাই। অন্যদিকে ইসরায়েলের ইহুদিরা মনে করে ঐ ভূমির ওপর তাদের ঐতিহাসিক দাবি রয়েছে। ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা যদিও বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গী লালন করতেন; কিন্তু তারা জানতেন ভূমির ওপর দাবির সঙ্গে ধর্মীয় যোগসূত্র জুড়ে না দিলে রাষ্ট্র হিসেবে একে টিকিয়ে রাখা যাবে না। ফিলিস্তিনি ও তাদের সমর্থকরা ইহুদিদের এই দাবি স্বীকার করে না। তাদের কথা—তারাই সেখানে বংশানুক্রমে বসবাস করে এসেছে। অন্যদিকে ইসরায়েলিরাও ভূমির ওপর দাবি ছাড়বে না। তারা মনে করে, এটি তাদের পরিচয় অস্তিত্বের অংশ। সম্প্রতি গাজায় বিমান হামলাসহ যুগ যুগ ধরে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকারের হাজার হাজার অভিযোগ—এই কারণে তারা গায়ে মাখতে নারাজ।

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের নিরসনের জন্য এ পর্যন্ত কম পরিকল্পনা, প্রস্তাব, রোডম্যাপ ও কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ হয়নি; কিন্তু কোনো কিছুতেই কিছু হয়নি। পরিস্থিতি সেই সাত দশক আগের মতোই রয়ে গেছে। উভয় পক্ষে বেড়েছে হতাশা, সন্দেহ, অবিশ্বাস। পরিস্থিতি আরো জটিল করেছে রাজনীতিবিদরা। জেরুজালেম, শরণার্থী, ফিরে আসার অধিকার ও সীমান্তের মতো মৌলিক ইস্যুগুলোতে কোন পক্ষের ছাড় দেওয়া সম্ভব। কারণ সেটি করা হলে নিজেদের পরিচয় ও অস্তিত্বকে অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করানো হবে।