জন্মদিন

নজরুলের জন্মদিনে

আপডেট : ২৪ মে ২০২১, ১৯:৫৮

১১ই জ্যৈষ্ঠ এলে ফজলে লোহানীর মাসিক ‘অগত্যা’র ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যার (আষাঢ় ১৩৫৬) সম্পাদকীয়টির কথা মনের গহীনভিতরে করুণ আর্তচিত্কারের মর্মান্তিকতা নিয়ে ধাক্কা খেতে থাকে। সম্পাদকীয়টি প্রথমে পাঠ করি ১৯৮৯ সালে। তখন থেকেই ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত কবির দুস্থ জীবনের কথা স্মরণ করে সত্যি সত্যিই খুব লজ্জাবোধ করি। কারণ নজরুলের জীবনেতিহাস পাঠে খুব অবাক-বিস্ময়ে লক্ষ করি যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন তিনি সকলের আগে দেখেছিলেন বলে স্বীকার করা হলেও কোনো একজন মানুষও দায়িত্ব নিয়ে এই নির্বাক অসুস্থ ‘জাতীয় কবি’র প্রতি ফিরেও তাকাননি। অথচ প্রতি জন্মদিনে খরচাপাতি করে ঠিকই জন্মদিনের উত্সব-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ যেন অসুস্থ কবির দুর্দশা নিয়ে উপহাস করা! মাহমুদ নূরুল হুদা রচিত ‘চিরঞ্জীব নজরুল’ খুললে প্রতিটি পাতায় কবিকে নিয়ে পাকিস্তান সরকারের মুসলমান নেতা আর ‘নজরুল রচনাবলী’ প্রকাশ করা ঢাকার বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের নজরুল-দরদি, সম্পাদক, পরিচালক যিনিই হোন না কেন, সকলেই তাঁর লেখার ন্যায্য সম্মানী-রয়্যালিটির টাকাটা পর্যন্ত পাইয়ে দেবার ব্যাপারে নিদারুণ নীরবতা পালন করেছিলেন।

‘অগত্যা’র সেই ঐতিহাসিক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল—

হে কবি

তোমার জন্মদিন ঘিরে আজ যে আন্দাজ কলকোলাহল আর আলোড়ন জাগছে দেশময়—তাতে ‘তুমি আছ কি নেই’ সেই প্রশ্নই বারবার লাঞ্ছনার মতো উচ্চকিত হচ্ছে আমাদের সামনে। কত দিন আর বাঁচবে তুমি? দেখছ না, তোমার জীবন আমাদের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে। ব্যাপক আয়োজন আর সমারোহ সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে তোমার অস্তিত্বের প্রতি একটা নিরঙ্কুশ ব্যঙ্গ! তুমি বেঁচে আছ তবু তোমাকে ছাড়াই আজ তোমার জন্মতিথি উদযাপন করা হচ্ছে!

অন্ধকার কক্ষে তুমি পঙ্গু জীবনের শেষ দিন গুনছ, হয়তো তুমিও জানো না আজ তোমার জন্মদিন,... ...কিন্তু বাইরে দেখো আমরা কি ঘটা ক’রে তোমার জন্মদিন পালন করছি। তুমি আমাদের প্রিয় কবি, তাই তোমাকে ছাড়াই কত আনন্দ, উচ্ছলতা আর কত অনুপ্রেরণা... ...কত মাতামাতি করছি তোমার সাহিত্য, দর্শন, কাব্য নিয়ে সভাসমিতিতে।

যারা তোমার লেখা এক পাতাও পড়েনি, এমন কত নেতা আজ অভিনেতার বাকচাতুর্যে সভায় দাঁড়িয়ে তোমার দর্শন আর কাব্যের বুলি কপচাচ্ছে। চেয়ে দেখো, মঞ্চের পেছনে আরো কতোজন দাঁড়িয়ে আছে তোমার জীবন-তত্ত্বের ওপর আলোচনা করবার জন্যে। হাজার হোক, আমরা প্রতিভার দাম দিতে জানি। তুমি এবার তাদের সুযোগ দাও! কি হবে আর বেঁচে!

হে আমাদের অমর কবি, জানি তুমি বিদ্রোহী, জানি তুমি সৈনিক, জানি তুমি একদিন অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ রোধ করার জন্যে উদাত্ত কণ্ঠে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলে। কিন্তু আজ আর কেন?... ...তুমি তো ভালো করেই চেন এ জাতিকে.... ...জানোই তো আমরা ছেঁড়া জুতোর দাম দিই না।

তোমার মৃত্যু হোক, আর এক মাইকেলের জন্ম দাও তুমি। নেতারা পা’ক তোমার ওপর কিছু বলবার—করবার যখন কিছু তাদের নেই-ই।! আর তোমার বেঁচে থেকে লাভ কি? কৃতঘ্নতা ও নির্লজ্জতার শেষ তুমি কখনোই দেখতে পাবে না?

 

দুই

পাশাপাশি চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত মফিজ উল হক সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন ‘পরিচিতি’র প্রথম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় (মাঘ-চৈত্র ১৩৫৮) প্রথম পৃষ্ঠার শুরুতেই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলা হয় যে,

বিদ্রোহী কবি আজ মৃত্যুশয্যায়। কবিকে বাঁচাবার জন্যে সংগঠিত কোনো প্রচেষ্টা আজো পর্যন্ত হয়নি। আমরা জানি কোনো বঙ্গের সরকারই কবির সুচিকিত্সার ব্যবস্থা করবে না। যদি করত তাহলে হয়তো দিনের পর দিন কবিকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে হতো না। তাই কবিকে বাঁচাবার দায়িত্ব আমাদের—সাধারণ জনতার।

কবিকে সুচিকিত্সার জন্য বিদেশে পাঠাবার মহত্ প্রচেষ্টা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট শিল্পী সাহিত্যিক ও সাধারণ নাগরিকবৃন্দ সুপরিকল্পিতভাবে এগিয়ে এসেছেন। এ বিষয়ে সাহায্য করার জন্যে তাঁরা উভয় বঙ্গের সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন। এবং এ আহ্বানে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিল্পী সাহিত্যিক ও নাগরিকবৃন্দও সাড়া দিয়েছেন।

 

তিন

পক্ষান্তরে, নজরুল-সুহূদ মাহমুদ নূরুল হুদা লিখেছেন:

১৯৪২ সালের জুলাই মাসের দিকে কবি যখন আক্রান্ত হন তখন তাঁর প্রাথমিক চিকিত্সা হয়েছিল। কিন্তু এই অসম্পূর্ণ চিকিত্সা স্বাভাবিকভাবেই দুঃখজনক পরিণতি নিয়ে আসে। সে সময় বিদেশে পাঠানো হলে তাঁকে হয়তো নিরাময় করা যেত। অনেকে কবির চিকিত্সার জন্যে ইউরোপ পাঠানোর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে অজুহাত হিসাবে উল্লেখ করেন। কিন্তু এটা তখনই মেনে নেওয়া যেত যদি বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই তাঁকে ইউরোপ পাঠানো হতো। কিন্তু কবিকে ইউরোপ পাঠানো হয়েছিল ১৯৫৩ সালের মে মাসে।

আসলে অপরিসীম অবহেলার কারণেই বিদ্রোহী কবিকে অল্পবয়সেই নির্বাক হয়ে যেতে হয়েছিল। একদিকে কবির চিকিত্সার জন্য সরকারিভাবে সময়ানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, অন্যদিকে দেশেবিদেশে কবির চিকিত্সার নামে যেসব অর্থ সংগৃহীত হয়েছিল তার খুব সামান্য পরিমাণই কবি পরিবারের হাতে এসেছিল।

এরপর আর মন্তব্য করার ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না।

মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম সম্পাদিত মাসিক ‘পূবালী’র নজরুল সংখ্যা (১ম বর্ষ ৯ম সংখ্যা, জ্যৈষ্ঠ ১৩৬৮) থেকে। সংগ্রাহক ইসরাইল খান