গোপালগঞ্জে মধুমতীর পানিতে অস্বাভাবিক মাত্রার লবণ

আপডেট : ২৪ মে ২০২১, ২০:২৭

গোপালগঞ্জে মধুমতী নদীর পানিতে গত ১০ বছরের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি লবণাক্ততার মাত্রা পাওয়া গেছে। এ বছর মধুমতী নদীর পানিতে ২ হাজার ১০০ পিপিএম লবণাক্ততা পাওয়া যায়। এ লবণাক্ততা মানবদেহ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ক্ষতি করছে। মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে মধুমতী নদীর তীরবর্তী জনপদে ডায়রিয়া মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।

গোপালগঞ্জ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক চন্দ্র তালুকদার জানান, পরীক্ষায় এ বছর মধুমতী নদীর পানিতে ২ হাজার ১০০ পিপিএম লবণাক্ততা ধরা পড়েছে। গত ১০ বছর ধরে গ্রীষ্মকালে মধুমতী নদীতে সমুদ্র থেকে লবণপানি চলে আসছে। ২০১৬ সালে মধুমতী নদীর পানিতে ১ হাজার ২০০ পিপিএম লবণাক্ততা পাওয়া যায়। এরপর এ বছর সর্বোচ্চ মাত্রার লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। মানবদেহের জন্য সহনীয় লবণের মাত্রা ৬০০ পিপিএম। কিন্তু গোপালগঞ্জে মানবদেহের জন্য সহনীয় মাত্রার তিনগুণেরও বেশি লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ‘গোপালগঞ্জ ও টুঙ্গিপাড়া পৌরসভায় মধুমতী নদীর পানি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে বিশুদ্ধ করে সরবরাহ করা হয়। গ্রীষ্মকালে বিশেষ করে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সরবরাহ পানিতে লবণ চলে আসে, এতে দুই পৌরসভার অন্তত ৩ লাখ মানুষ খাওয়ার পানির সংকটে পড়েন। এ অবস্থার স্থায়ী সমাধানে তিনি এই দুই পৌরসভায় আরো প্ল্যান্ট স্থাপনের পরামর্শ দেন।’

গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মুহাইমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রীষ্মে উজানের পানির উত্স কমে যায়। তখন মধুমতী নদীতে বঙ্গোপসাগরের পানি ঢুকে পড়ে। এতে মধুমতী নদীর পানি লবণাক্ত হয়ে পড়ে। এ বছর গ্রীষ্মকাল অনেক লম্বা হয়েছে। সেইসঙ্গে বৃষ্টিপাত নেই। প্রখর রোদে মধুমতী নদীতে লবণের মাত্রাও বেড়েছে। লবণাক্ত পানি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। লবণ ফসল ও পরিবেশের ক্ষতি করে। এছাড়া মিঠা পানির জীববৈচিত্র্যের জন্য লবণ মারাত্মক হুমকি। এভাবে লবণের আগ্রাসন চলতে থাকলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে।’

গোপালগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, ‘মধুমতীতে  লবণাক্ততার কারণে গোপালগঞ্জ ও টুঙ্গিপাড়ায় ডায়রিয়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। লবণাক্ত পানি পান করলে ডায়রিয়া, আমাশয়, ক্ষুধামন্দা, উচ্চ রক্তচাপ, চর্মরোগসহ মানবদেহে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। এসব জটিলতা অবসানে তিনি লবণাক্ত পানি পান না করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘পুকুর ও ডিপ টিউবওয়েলের পানি ফুটিয়ে পান করতে হবে।’ গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণের ডিডি ড. অরবিন্দু কুমার রায় বলেন, ‘সাধারণত মধুমতী নদীতে লবণাক্ততা প্রায় চার মাস স্থায়ী হয়। জমিতে লবণ পানি ব্যবহার করলে জমি লবণাক্ত হতে পারে। এতে ফসলের উত্পাদন কমে যেতে পারে। তাই কৃষকদের কৃষি কাজে নদীর পানি ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে বলছি। তাদের পুকুর, শ্যালো অথবা ডিপ টিউবওয়েলের পানি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’ গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোবরা গ্রামের কৃষক রবিন চৌধূরী,  টুঙ্গিপাড়া উপজেলার কুশলী গ্রামের কৃষক মানিক মিয়া, একই উপজেলার গোপালপুর গ্রামের তরুণ বিশ্বাস বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই প্রতি বছর মধুমতী নদীর পানি লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। যত দিন যাচ্ছে পানিতে লবণ বাড়ছেই। এ পানি জমিতে ব্যবহার করলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফসলের উত্পাদন কমে যায়। পুকুর থেকে পাম্পের মাধ্যমে খেতে পানি দিলেও যেটুকু দরকার সেটুকু দিতে পারছি না। এতে কৃষিকাজে উত্পাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া খাওয়ার পানির সংকটে আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এ পানি পান করে আমরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছি।