প্রকৃতির অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ বৃদ্ধি পাইয়াছে

আপডেট : ২৪ মে ২০২১, ২১:২১

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ। আবহমানকাল হইতেই ঘূর্ণিঝড়, খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী, নদীভাঙনসহ নানা প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক লইয়াই আমরা বসবাস করিয়া আসিতেছি। হালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উন্নতির ফলে এই ধরনের অনেক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করিতে সক্ষম হইয়াছি আমরা। কিন্তু ইদানীং বজ্রপাতে প্রাণহানি যেই হারে বাড়িতেছে তাহাতে উদ্বিগ্ন না হইয়া পারা যায় না। ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসাবে ঘোষণা করা হইয়াছে বটে, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমাইয়া আনিতে সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি শ্লথ। জনসচেতনতায়ও আসেনি তেমন কোনো উন্নতি। গত ১৮ মে এক দিনেই সারা দেশে ১৭ জন ব্যক্তি বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করিয়াছেন। দেড় মাসে মারা গিয়াছেন ১৬৭ জন। অন্য যে কোনো দুর্যোগের তুলনায় এই বজ্রপাতে এখন মানুষের মৃত্যুহার ক্রমবর্ধমান। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ হইতে ২০২০ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে ২ হাজার ৭৭৪ জন মানুষ মারা গিয়াছেন। কিন্তু এখন প্রতি বত্সর গড়ে মারা যাইতেছেন তিন শতাধিক ব্যক্তি।

সাধারণত উত্তপ্ত ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বজ্রপাত বেশি হয়। বায়ুস্থিত শক্তির পার্থকের কারণে কিছু কিছু মেঘের অভ্যন্তরে পানি ও বরফের কণিকার ঘর্ষণ কিংবা গতির ফলে মাত্রাতিরিক্ত স্থির বিদ্যুত্ জমিয়া গেলে তাহা নিকটস্থ মেঘ বা ভূমির দিকে ছুটিয়া আসে। ইহাকেই বলে বজ্রপাত। ইহার তাপমাত্রা ৪০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতিবেগ ঘণ্টায় ২ লক্ষ ২০ হাজার কিলোমিটার। বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে কোথাও না কোথাও ৪০ হইতে ১০০টি বজ্রপাত হইতেছে। আমাদের দেশে এপ্রিল হইতে জুন এই সময়ে বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটিয়া থাকে। গবেষকরা মনে করেন, বাতাসে সিসার পরিমাণ বৃদ্ধি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, মোবাইল ফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারজনিত রেডিয়েশন, গ্রামাঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি, তালগাছসহ উঁচু গাছের সংখ্যা হ্রাস, জলাভূমি ভরাট ইত্যাদি কারণে বজ্রপাতের ঘটনা বৃদ্ধি পাইতেছে। বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়িলেই বজ্রপাতের আশঙ্কা বৃদ্ধি পায় ১০ শতাংশ। ইহা প্রতিরোধযোগ্য নহে, তবে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ ও সচেতনতার মাধ্যমে আমরা প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা কমাইয়া আনিতে পারি। হিমালয়ের পাদদেশ হইতে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের কেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত বলিয়াই বাংলাদেশ অধিক বজ্রপাতপ্রবণ একটি দেশ।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অধিক হারে বজ্রপাত হইতেছে। ইহাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মারা যাইতেছে গ্রামগঞ্জের কৃষক ও মত্স্যজীবী মানুষ। এই বজ্রপাত কমাইয়া আনিতে ৫০ লক্ষ তালগাছ লাগানো হইয়াছে। কিন্তু মুশকিল হইল ইহার সুফল পাইতে আমাদের সময় লাগিবে। কেননা একটি তালগাছ পরিপক্ব হইতে ২০ বত্সরও লাগিয়া যায়। বজ্রপাত নিরোধের আরেকটি উপায় হইল কৃষিক্ষেত্রে ছাউনি স্থাপন করা। যেখানে শ্যালো মেশিন আছে তাহার আশপাশেই এমন ছাউনি গড়িয়া তুলা যায় সহজেই। ইহার ঝুঁকি প্রশমনে বজ্রপাতের পূর্বাভাস ও এলাকা শনাক্তকরণ যন্ত্র স্থাপন করা জরুরি। ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়কে এই ব্যাপারে উদ্যোগী হইতে হইবে। বজ্রপাতে যে শুধু কৃষক ও মত্স্যজীবীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাহা নহে। এই জন্য প্রত্যেক বাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বজ্রপাতনিরোধক দণ্ড স্থাপন তথা আর্থিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বজ্রপাত হইতে বাঁচিবার ১৮টি উপায় রহিয়াছে, যাহা এই সময়ে রেডিও, টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন আকারে প্রচারের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা আবশ্যক। তাল, নারিকেল, বটসহ বিভিন্ন প্রকার বড় গাছ রোপণে গ্রহণ করা দরকার নানা পদক্ষেপ। ইহা ছাড়া বজ্রপাতে আহত ব্যক্তির দ্রুত চিকিত্সা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করিতে হইবে।

বজ্রপাত মানুষের উপরে পড়িলে সেই ব্যক্তির বাঁচিয়া থাকিবার সম্ভাবনা থাকে না বলিলেই চলে। গাছের উপর পড়িলে গাছটিও মারা যায়। যেই ভাবে বজ্রপাত বৃদ্ধি পাইয়াছে, তাহা আমাদের জন্য অশনিসংকেত বহিয়া আনিতেছে। প্রকৃতির অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ হইল বজ্রপাত। প্রকৃতি ছাড়াও অস্থিরতা আরো অনেক ক্ষেত্রেই বাড়িয়াছে। এখন মানুষ কিংবা বৃক্ষরাজির ওপর না পড়িয়া কোনো ভয়ংকর বজ্রপাত যদি আরো বৃহত্ কোথাও পতিত হয়, তাহা আরো বড় বিপর্যয় ডাকিয়া আনিবে। ইহাও ভাবিয়া দেখিতে হইবে।