বিকল্প গণপরিবহন, যানজটে বিশেষ সুবিধা, দেশে উত্পাদন, জ্বালানি সাশ্রয়, কিস্তিসুবিধাসহ আগ্রাসি বিপণন, রাইড শেয়ারিং প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশের রাস্তায় ক্রমশ বাড়িতেছে মোটরসাইকেলের সংখ্যা। নগরে গণপরিবহনের দুর্দশায় অনেকই বাছিয়া নিতেছেন মোটরসাইকেলকে। এমনকি নারীরাও এখন পথেঘাটে চালাইতেছেন স্কুটি। দেশে এখন কমপক্ষে সাতটি সুপরিচিত ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের কারখানা স্থাপিত হইয়াছে। গড়িয়া উঠিয়াছে দেশি ব্র্যান্ড রানার। দেশে মোটরসাইকেল শিল্প বিকাশের খবরটি নিঃসন্দেহে আনন্দদায়ক। কিন্তু ইহার পাশাপাশি আমাদের জন্য দুঃখের খবরও রহিয়াছে। খবরটি হইল, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সূত্র অনুযায়ী এবারের ঈদুল ফিতরের ঈদযাত্রা শুরুর দিন গত ৭ মে হইতে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা ২১ মে ২০২১ পর্যন্ত ১৫ দিনে ৩১৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে ৩২৩ জন নিহত ও ৬২২ জন আহত হইয়াছেন। খবর বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরাবরের মতো এইবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রহিয়াছে মোটরসাইকেল। এবারের ঈদে ১৪৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৯ জন নিহত ও ১৯৯ জন আহত হইয়াছেন, যাহা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪৫ দশমিক ২৮ শতাংশ, নিহতের ৪৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ এবং আহতের ৩১ দশমিক ৯৯ শতাংশ প্রায়। রাস্তায় ছোট যানবাহন মোটরসাইকেলের দাপট বাড়িলেও বিশৃঙ্খল এই যাতায়াতের চিত্র কম উদ্বেগজনক নহে।
প্রশ্ন হইল, বিশৃঙ্খলা কোথায় নাই? সর্বক্ষেত্রে নিয়ম না মানিয়া চলিবার প্রবণতাই প্রকাশ পাইতেছে। অবস্থা এমন যে, ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দিব কোথা?’ শৃঙ্খলা ফিরাইবার চেষ্টা আমরা কোথা হইতে শুরু করিব তাহাই আজ বড় প্রশ্ন হইয়া দেখা দিয়াছে। অথচ বিশ্বে একটি বিশৃঙ্খল জাতি কখনো মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে পারে না। বৈদিক ভারতীয় সংস্কৃতি অনুসারে সৃষ্টির স্বরূপ হইল পরমাত্মা। আর জীবনের লক্ষ্য হইল কর্ম, ভক্তি ও জ্ঞান দ্বারা সেই পরমাত্মার সঙ্গে অন্তরাত্মার মিলন। এই পথে চলিবার জন্য পরম পাথেয় হইল শৃঙ্খলা। ইহা ছাড়া বলা হয়, সৌর ও পৌর উভয় পরিবেশে শৃঙ্খলার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃতি শৃঙ্খলাবদ্ধতার পরিচয় দিয়া নিয়ম মানিয়া চলে। কিন্তু মানুষ জন্মগতভাবে স্বার্থপর বিধায় পদে পদে নিয়ম লঙ্ঘন ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে। উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ও সংস্কৃতি উঁচু মানের বিধায় সেখানকার মানুষ আইনশৃঙ্খলা মানিয়া চলে। কিন্তু অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে নিয়মকানুনের পরিপালন দুঃখজনকভাবে কম। ইহাতে সর্বক্ষেত্রে বাড়ে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা। আমাদের সড়কে ন্যূনতম শৃঙ্খলা নাই বলিলেই চলে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন হইল, সরকারিভাবে কতবার সচেতনামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হইল। কিন্তু ইহা সত্ত্বেও যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল বন্ধ হয় নাই। শুধু মোটরসাইকেলকে দোষ দিয়া লাভ নাই। বাস, ট্রাক, মিনিবাস, পিকআপ, ভ্যান, রিকশা, অটোরিকশা, নসিমন, করিমন, ভটভটি ইত্যাদি যানবাহনের অনেক চালকই নিয়ম মানিয়া রাস্তায় চলিতেছেন না। পথযাত্রীরাও রাস্তা পারাপারে নিয়ম মানার প্রতি তোয়াক্কা করিতেছেন না।
এদিকে যাহারা নিয়মকানুন প্রণয়নে জড়িত বা পরিপালন ঠিকমতো হইতেছে কি না, তাহা দেখভাল করিবার দায়িত্বে নিয়োজিত, তাহারাও যখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেন, তখন সর্বত্র বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়াটাই কি স্বাভাবিক নহে? এই কথা আমাদের যাপিত জীবনের সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যাহারা তরুণ মোটরসাইকেলচালক, তাহাদের অনেকে ইহাকে প্যাশন হিসাবে নিয়া থাকেন। তাহাদের মধ্যে বাইক রেসিংয়ের প্রবণতাও বাড়িতেছে। ফলে ৩৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই ঘটিয়াছে নিজেদের মধ্যে অর্থাত্ মোটরসাইকেল টু মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে। সুতরাং মোটরসাইকেলসহ সকল চালককেই সচেতন হইতে হইবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের মতো সড়কে চলিবার সময়ও তাহাদের মানিয়া চলিতে হইবে নিয়ম ও শৃঙ্খলা।
