গাজা আগ্রাসনের রাজনৈতিক অঙ্ক

আপডেট : ২৫ মে ২০২১, ২১:১৮

স্পষ্ট হচ্ছিল অনন্য এক ইতিহাসেরই পথরেখা। ইসরাইলের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো একটি আরব দল সরকারের শরিক হতে যাচ্ছিল। এবং দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় গদিনশিন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিদায়ঘণ্টায় বাড়ি পড়া স্রেফ সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। এ দুটি ঘটনা বাস্তবতার জল-হাওয়া পেলে আরব-ইহুদি সম্পর্কেও নতুন মাত্রা যোগ হতো নিঃসন্দেহে। তখনই গাজার আকাশ ছেয়ে গেল ঝাঁকে ঝাঁকে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানে, ইসরাইলের দিকে ছুটল হামাসের একের পর এক রকেট। ইসরাইলের ইহুদি-আরব মিশ্র শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল সংঘর্ষ।

দুই বছরে পরপর চারটি নির্বাচন হলেও সরকার জোটেনি ইসরাইলিদের কপালে। ২০১৮ সালের পরে বার্ষিক বাজেট হয়নি। জটিলতা তৈরি হয়েছে নীতি নির্ধারণে। অন্তবর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিজেই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত। ক্ষমতার রাশ হাতছাড়া হলে তাকে শীত যেতে হতে পারে, এ আশঙ্কা অমূলক নয়। তাই রাজনৈতিক জীবনের বাজি নয় কেবল, নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত জীবনের দমও নির্ভর করছে ভোটের ফলে, সরকার গঠনে।

মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড আরব লিস্ট (হিব্রুতে রা’আম) বসহ ইয়ামিনা ও ইয়েশ আতিদ পার্টির নেতারা নেতানিয়াহু বিরোধী ছয়দলীয় জোটের আকার স্পষ্ট হচ্ছিল। এই জোট ভণ্ডুল হলে দক্ষিণপন্থি লিকুদ পার্টির নেতা নেতানিয়াহুরই যে সবচেয়ে বেশি লাভ, এ কথা গাজার নিয়ন্ত্রক হামাসেরও ততটাই জানা, যতটা জানেন রা’আম নেতা আব্বাস। তবু আদর্শগতভাবে র্যামের সমগোত্রীয় হামাস কেন সংঘাতের ফাঁদে পা দিল?

নেতানিয়াহু আর হামাস সম্পর্ককে অনেকেই যেমনটা বলে থাকেন—‘উদ্দেশ্যমূলক সহযোুগতার আভাস কি স্পষ্ট হয় না এই ‘পাতানো’ সংঘাতে? যারা পরস্পরের বিরোধিতা করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার রসদ খুঁজে পায়, তাদের একজন নেতানিয়াহুর জন্য এবারের সংঘর্ষ যতটা ‘বিশল্যকরণী’, অপর পক্ষ হামাসের জন্য কিন্তু ততটা নয়। তবু ইজরাইলের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়াই তাদের অস্তিত্বের প্রশ্নে দরকারি। সংঘর্ষ বাধলে অক্সিজেন পাবেন নেতানিয়াহু, এ কথা জেনেও তাই হামাস ‘সায়’ দিয়েছে।

এটা পরিষ্কার ‘দ্বিরাষ্ট্রিক’ সমাধানে নেতানিয়াহু ও হামাসের কেউই খুব একটা আগ্রহী নয়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফেরার সময় হামাসকে খতম করার প্রতিশ্রুতি দিলেও নেতানিয়াহু এই সময়ের মধ্যে তেমন প্রয়াসী হয়েছেন, প্রমাণ নেই। হামাসও মুখে যতটা নেতানিয়াহুর পিণ্ডি চটকায়, বাস্তবে তার প্রতিফলন ততটাই কমজোরি।

ইসরাইলের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার শুরু ২০১৮ সালের নভেম্বরে। গাজায় হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির প্রতিবাদে জোট সরকার থেকে বেরিয়ে যায় আভিগদোর লিবারমানের দল ইসরাইল বেইতেনু। এরপর দফায় দফায় নির্বাচনের চক্করে ইসরাইল, কিন্তু সরকার গঠনে অগ্রগতি শূন্য। অবশ্য অতি দক্ষিণ থেকে তীব্র বাম—সব ভাবধারার একগুচ্ছ রাজনৈতিক দল এবং জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশ ইহুদি, এক-পঞ্চমাংশ আরব, এমন মিশ্র দেশ ইসরাইলে ধর্মের দাপটও লাগামছুট। উপরন্তু বহাল আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব। পার্লামেন্টে (নেসেট) সব দলের আসনসংখ্যা নির্ধারিত হয় প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে। ফলে যে কোনো দলের পক্ষেই একক গরিষ্ঠতা পাওয়া বেশ কঠিন। এ কারণে গত চারটি নির্বাচনের পর বিস্তর কথাবার্তা হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট আলোর মুখ দেখেনি।

এ পটভূমিতে গাজায় আরেক দফায় আগ্রাসন তাই নেতানিয়াহুর পালে হাওয়া। ফলে নেতানিয়াহুবিরোধী জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা যে মাঠে মারা যেতে বাকি নেই, তাতে প্রায় সবাই একমত। এর পরও যদি নেতানিয়াহু সরকার গঠনে ব্যর্থ হন, সেক্ষেত্রে শিগিগর ফের নতুন নির্বাচন দেখবে ইসরাইল; আড়াই বছরের মধ্যে পঞ্চম নির্বাচন। তাতে নেতানিয়াহুর বাজিমাত প্রায় নিশ্চিত ধরে নেওয়া হচ্ছে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বঞ্চনা, বর্বরতা তাড়িয়ে ফিরছে ফিলিস্তিনিদের। গাজা, পশ্চিম তীরের জীবন আরো দুর্বিষহ করে তোলে থেমে থেমে নরকসম নেমে আসা ইসরাইলি আগাসন। আর কত যুগ এভাবে যাবে কেউ জানে না! ১১ দিনে আড়াই শ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পর ঘোষিত যুদ্ধবিরতিতে হারল কে, জিত কার হলো—এই তরজায় যারা আগ্রহী, চালিয়ে যান। কিন্তু ধ্বংস ও মৃত্যুর প্রলয় ঘটিয়েও যে যে কেউ কেউ আখের গোছায়, ইতিহাস সাক্ষী।

n লেখক : সাংবাদিক