ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’-এর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে অতিবৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার সময় ভরা পূর্ণিমা থাকায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন উপকূলবাসী। স্থানীয় প্রশাসন ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তবে অনেক জেলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হলেও কাউকে সেখানে যেতে দেখা যায়নি। গতকাল মঙ্গলবার রাতে এ রিপোর্ট লেখার সময় বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট এই সুপার সাইক্লোনটির যে গতিপথ, তাতে আজ বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ এটি পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা উপকূলে আঘাত হানতে পারে। তবে এর প্রভাবে দেশের ১৪টি উপকূলীয় জেলায় তীব্র গতিতে ঝোড়ো বাতাস বয়ে যেতে পারে। কোথাও কোথাও ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হতে পারে। এদিকে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বিভিন্ন জেলায় গতকাল থেকে থেমে থেমে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জোয়ারের প্রভাবে নদনদীর পানি বেড়ে গেছে। পটুয়াখালী, ভোলা ও সাতক্ষীরার কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে ও পানি উপচে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সুন্দরবনের দুবলার চরসহ বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ টহল ফাঁড়ির বনরক্ষীসহ বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল থেকে পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় দমকা হাওয়াসহ থেমে থেমে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। দুপুরের জোয়ারের সময় কলাপাড়া উপজেলার লালুয়ায় বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে ৯ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ঐসব গ্রামের প্রায় ৮ হাজার মানুষ। রাঙ্গাবালী উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের বাইরের সব নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলসহ সাতটি গ্রাম জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চরআন্ডার ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় সহস্রাধিক মানুষ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক প্রস্তুতিমূলক সভায় পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী জানান, জেলায় ৮০৩টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে ৯৩টি। পাঁচটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।
শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে নদীতে তিন-চার ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল দুপুরের জোয়ারে শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের পাউবোর বেড়িবাঁধ উপচে ভেতরে পানি প্রবেশ করেছে। জয়াখালী ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চাউল খোলা, চন্ডিপুর ও খুটিকাটা এলাকায় বেড়িবাঁধ উপচে পানি ভেতরে প্রবেশ করলে স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে মাটি ও মাটির বস্তা দিয়ে পানির প্রবেশ পথ বন্ধ করেছে। ঘূর্ণিঝড়টি পূর্ণিমার বড় জোয়ারের সময় আঘাত করলে গোটা এলাকা প্লাবিত হবে বলে আশঙ্কা এলাকাবাসীর। ফলে উপকূলীয় এলাকার মানুষের মাঝে এখন ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ভোলা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি জানান, জেলার মেঘনা, তেঁতুলিয়াসহ সব নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বৃদ্ধি পেয়ে দুই ইউনিয়নের ছয় গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে চরফ্যাশন উপজেলার ঢাল চর ইউনিয়নের তিন গ্রাম ও চর মানিকা ইউনিয়নের তিন গ্রামের প্রায় ৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
মনপুরা (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বেড়িবাঁধের বাইরে অবস্থিত বাড়ি-ঘরগুলো ডুবে গেছে। এতে মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
রামগতি (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, মেঘনা নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারে উপজেলার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ-ছয় ফুট বেড়ে জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। এতে চরাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
খুলনা অফিস জানায়, ঘূর্ণিঝড় থেকে নিজেদের জানমাল রক্ষায় সুন্দরবন বন বিভাগের বনরক্ষীসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকিমুক্ত ফাঁড়িতে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলে-মৌয়ালীদের সুন্দরবনে প্রবেশের পারমিট বন্ধ করে দেওয়াসহ সুন্দরবনে অবস্থানরত জেলে ও মৌয়ালীদের দ্রুত লোকালয়ে ফিরে আসার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ পর্যবেক্ষণে সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে দুটি পর্যবেক্ষণ টিম গঠন করেছে। সুন্দরবনের বন সংরক্ষক (সিএফ, খুলনা সার্কেল) মো. মঈনুদ্দীন খান এসব কথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে ‘ইয়াস’ ধেয়ে আসার খবরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে ‘আম্ফান’ বিধ্বস্ত খুলনার সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলবাসী। অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। উপকূলের মানুষের মধ্যে জলোচ্ছ্বাসের আতঙ্ক বিরাজ করছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আজিজুল হক জোয়ার্দ্দার জানান, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১ হাজার ৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র ও ১১৬টি মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, দুপুর থেকে জেলায় হালকা বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া শুরু হয়েছে। জেলার মোট ৮০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অধিকাংশ স্থানই ঝুঁকিপূর্ণ। ইতিমধ্যে খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদীর পানি চার-পাঁচ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলায় ১৪৫টি সাইক্লোন শেল্টারসহ মোট ১ হাজার ৬৪৫টি আশ্রয়কেদ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে কোনো লোক উঠতে দেখা যায়নি। জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
পিরোজপুর অফিস ও শরণখোলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, সুন্দরবন উপকূলে প্রবলবেগে বাতাস বইছে ও বৃষ্টি হচ্ছে। সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে বন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। যদিও দুবলার চরসহ সাগর উপকূলে কোনো জেলের অবস্থান নেই। অনেকে সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে।
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, সুপার সাইক্লোন মোকাবিলায় উপজেলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৮৩টি সাইক্লোন শেল্টার। ইয়াস আতঙ্কে রয়েছে উপজেলাবাসী।
