আমরাও ঋণ দিতে পারি!

আপডেট : ২৬ মে ২০২১, ২০:৫১

মানুষের যেমন চিরটাকাল এক রকম যায় না, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও এই ভাঙা-গড়া আমরা নিত্য দেখিয়া থাকি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই প্রসঙ্গে চমত্কার করিয়া বলিয়াছেন—‘এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে/ এই তো নদীর খেলা রে ভাই/ এই তো বিধির খেলা/ সকাল বেলার আমির রে ভাই/ ফকির সন্ধ্যাবেলা।’ আমরা অবশ্য স্বাধীনতার সময় অর্থাত্ সকাল বেলায় ফকির ছিলাম, কিন্তু সেই ফকিরি দশা আমরা ক্রমশ কাটাইয়া উঠিতেছি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হইতে শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে গতকাল বুধবার ২০ কোটি ডলার ধার দেওয়ার সিদ্ধান্ত লইয়াছে বাংলাদেশ। গৃহযুদ্ধের ক্ষত, উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণসহ নানা কারণে এই মুহূর্তে অত্যন্ত চাপের মধ্যে রহিয়াছে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি। ২০১৮ সালে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হইলেও তাহা এখন নামিয়া আসিয়াছে মাত্র ৪ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে মহামারি করোনার মধ্যেও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়িয়া ৪৫ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করিয়াছে। এই অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হইতে প্রথমবারের মতো ঋণ প্রদান করিয়া শ্রীলঙ্কার প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়াইয়া দিয়াছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের এই বিপুল রিজার্ভের ক্ষেত্রে সর্বাংশে অবদান রহিয়াছে আমাদের কোটির অধিক প্রবাসী কর্মজীবীদের। রিজার্ভ সমৃদ্ধিতে প্রবাসীদের পাশাপাশি প্রভূত অবদান রহিয়াছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবত্সরের জুলাই-এপ্রিল রেমিট্যান্স আসিয়াছে ২ হাজার ৬৬ কোটি ৫৯ লক্ষ ডলার। বরারবই বলা হইয়া থাকে, আয়তনের তুলনায় দেশের বিপুল জনসংখ্যা আমাদের বোঝা হইয়া উঠিবে। ইহার অবশ্য দুইটি দিক রহিয়াছে। ইহার একটি হইল কর্মক্ষম জনসংখ্যা। আমাদের বিপুল কর্মক্ষম জনসংখ্যা রহিয়াছে বিধায় তাহার একটি অংশ কর্মসংস্থানের জন্য প্রবাসে ছুটিয়াছে। আর, অন্য দিকটি হইল বাজার। ইহা ঠিক কেবল জনসংখ্যা থাকিলেই হয় না, উহাদের ন্যূনতম ক্রয়ক্ষমতাও থাকিতে হয়। তাহা অবশ্য বহুলাংশে আমাদের রহিয়াছে। এই ক্ষেত্রে আমাদের শিল্পোত্পাদন ও ভোক্তা-চক্রের গতিময়তাও গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং জনসংখ্যার বড় একটি অংশ আমাদের অর্থনীতির জন্য অভিশাপ না হইয়া আশীর্বাদ হইয়াছে। এই ক্ষেত্রে মনে রাখিতে হইবে, বাংলাদেশ যে উন্নতি করিতে পারে তাহা লইয়া ৫০ বত্সর আগে বিশ্বের বড় বড় অর্থ-বিশেষজ্ঞরা বড্ড বেশি সন্দিহান ছিলেন। একাত্তরে পাকিস্তানের পোড়ামাটি নীতির ধ্বংসস্তূপের তলায় চাপা-পড়া সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশকে লইয়া বলা যায় বিশ্বের বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞই ঠাট্টা করিতেন। সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতি লইয়া বিশ্বব্যাংক সেই সময় বলিয়াছিল—সবচাইতে ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল। এই বিষয়ে আমরা আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটির নাম—বাংলাদেশ দ্য টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট। ১৯৭৬ সালে লন্ডন হইতে নরওয়ের অর্থনীতিবিদ জাস্ট ফাল্যান্ড এবং মার্কিন অর্থনীতিবিদ জে আর পার্কিনসন এই গ্রন্থে বলিয়াছেন—বাংলাদেশ হইতেছে উন্নয়নের একটি পরীক্ষাক্ষেত্র। বাংলাদেশ যদি তাহার উন্নয়ন সমস্যার সমাধান করিতে পারে, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে পৃথিবীর যে কোনো দেশই উন্নতি করিতে পারিবে। অর্থাত্ উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো খারাপ অবস্থা পৃথিবীর আর কোনো দেশের ছিল না! সেই বাংলাদেশই অসম্ভবকে সম্ভব করিয়াছে। বিগত অর্ধশতকে আমাদের অর্থনৈতিক সামষ্টিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাইয়াছে ৭৩ গুণ!

তবে এত অর্জনের মধ্যেও বলিতে হয়, পরাধীনকালে এই জনপদে কয়েক জন মাত্র বিদেশি লুণ্ঠনকারী ছিলেন। কিন্তু এখন শত-শত স্বদেশি লুণ্ঠনকারী সৃষ্টি হইয়াছেন। রাষ্ট্রীয় অপচয় ও দুর্নীতির লাগামও যতটা আশা করা হইয়াছিল, ততখানি টানিয়া ধরা সম্ভব হয় নাই। আমাদের বৃহত্তর অর্জনের দিকে অগ্রসর হইতে হইলে এই সকল ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর দিতে হইবে। নইলে বর্তমান সময়ের ‘সকাল বেলার অর্জন’ পরবর্তী সন্ধ্যাবেলায় ভিন্ন রূপ ধারণ করিতে পারে। নজরুলের ঐ কবিতার মতোই।