শিক্ষা ক্যাডারের এপিঠ-ওপিঠ

আপডেট : ২৬ মে ২০২১, ২০:৫৭

যে কোনো কাজ বা চাকরির ক্ষেত্রে পদোন্নতি একটি অপরিহার্য উপাদান। শিক্ষকতা পেশায় বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। ফলে এই পেশার প্রতি অনেকেরই আগ্রহ ছিল না এবং এখনো নেই। স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করলে ‘মাস্টার’ আর কলেজে শিক্ষকতা শুরু করলে ‘প্রফেসর’ বলে শিক্ষকগণ আমাদের সমাজে পরিচিতি পান। অন্যান্য চাকরির মতো এ পেশায় ঘন ঘন সিঁড়ি নেই, এক্সাইটমেন্ট নেই, সহজে বেতন পরিবর্তনের খুব একটা নজির নেই। তাই এত ক্রিয়েটিভ, এত উত্তেজনাকর এবং এত আনন্দের একটি পেশাকে একেবারে নিরানন্দ করে ফেলা হয়েছে। সেভাবে পারসেপশন তৈরি হয়েছে সবার ভেতরেই। সমাজ সেভাবেই দেখে আসছিল এবং এখনো দেখে আসছে।

আমার মনে আছে, আমি যখন রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে শিক্ষকতা করতাম, তখন বিভিন্ন সভা ও অনুষ্ঠানে তত্কালীন শিক্ষাসচিব (যিনি গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান) প্রায়ই যেতেন। একদিন তিনি বললেন, শিক্ষা প্রশাসনে পরিবর্তন আসবে। পরিবর্তনটি কী? তিনি বললেন, মাউশির ডিজি একজন কলেজের শিক্ষক, শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যান ও কন্ট্রোলারগণ একেকজন শিক্ষক। এছাড়া শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন পদে শিক্ষকেরা আছেন। তার কথা হচ্ছে, শিক্ষকগণ শিক্ষক থাকবেন, শিক্ষকতা করবেন। ঐ সব প্রশাসনিক পদে কেন? প্রশাসনিক পদে থাকবেন অ্যাডমিনিন্ট্রেশন ক্যাডারের লোকজন। আমার মনে আছে, এ নিয়ে বেশ কয়েক বার বাংলা ও ইংরেজি দৈনিকে লিখেছিলাম যে, শিক্ষা প্রশাসনে শিক্ষকদেরই থাকতে হবে। অনেকেই সমর্থন করেছেন, অনেকে পক্ষে কথা বলেছেন। তার পরেও কয়েকবার চেষ্টা করা হয়েছে ঐ সব পদে আমলাদের বসাতে। সেই ধারণা থেকে কিংবা অবহেলা থেকে শিক্ষকদের পেশায় খুব একটা সিঁড়ি তৈরি করা হয়নি। মাঝে মাঝে একটু শুরু হয়, আবার হঠাত্ করে থেমে যায়। শিক্ষকদের পদোন্নতির প্রক্রিয়াও খুব একটা বেশি দিন আগে শুরু হয়নি।

অন্যান্য চাকরির মতো শিক্ষা ক্যাডার বেশি দিনের নয়। তার পরেও ক্যাডার হিসেবে শিক্ষা ক্যাডার সবচেয়ে বড়। বর্তমানে এই ক্যাডারে কর্মরত কর্মকর্তার সংখ্যা সাড়ে ১৩ হাজারের বেশি। সরকারি প্রায় ৩০০ কলেজকে নতুন করে সরকারীকরণ করায় এই ক্যাডারে আরো সাড়ে ১২ হাজার পদ সৃষ্টির বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। অথচ এটিই আবার সবচেয়ে দুর্বল ক্যাডার। শিক্ষা ক্যাডারের প্রতি রাষ্ট্রীয় আচরণ দু-একটি উদাহারণ দিলেই বোঝা যাবে। যেমন ২৮তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তারা বহু আগেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হয়েছেন। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারাও উপসচিব হওয়ার অপেক্ষায়। অথচ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা এন্ট্রি পদেই রয়ে গেছেন, অর্থাত্ তারা লেকচারার। অন্যান্য ক্যাডারে দুটি, কোথাও একটি পদোন্নতি হলেও ২৮তম ব্যাচের শিক্ষা ক্যাডারের গণিত বিষয়ের শিক্ষকেরা ১১ বছর ধরে প্রভাষক পদেই আছেন। সমস্যা এখানেই শেষ নয়, আপনি যদি দর্শনের শিক্ষক হন কিংবা ইতিহাসের, আপনি হয়তো সহকারী এমনকি সহযোগী অধ্যাপক হয়েছেন। আপনার ব্যাচের, আপনার ক্লাসমেট একই সঙ্গে চাকরিতে প্রবেশ করেছেন হয়তো ইংরেজি কিংবা গণিতের শিক্ষক হিসেবে, তিনি তখনো লেকচারার। অর্থাত্, সুষ্ঠু কোনো নিয়ম নেই।

শিক্ষা ক্যাডারে কর্মকর্তাদের বঞ্চনার মূল কারণ হিসেবে তারা বলছেন যে, এই ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি দেওয়া হয় না, যেটি করা হয় অন্যান্য ক্যাডারের ক্ষেত্রে। কোনো বিষয়ে ওপরের পদ শূন্য হলেই কেবল ঐ বিষয়ের নিচের দিকের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পান। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেওয়া কর্মকর্তাদের বেশির ভাগ শিক্ষকতায় যুক্ত থাকলেও একাংশকে প্রেষণে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও প্রকল্পে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত তিন বছর ধরে এই ক্যাডারে সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক পদে কোনো পদোন্নতি হয়নি। এমনটি আর কোনো ক্যাডারে হয়েছে কি? হয়নি। ফলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের হিসাবমতে, এ দুই পদে এই মুহূর্তে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তার সংখ্যা ৫ হাজার ৭১১। শোনা যাচ্ছে, শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতি-বঞ্চনার অবসান হতে যাচ্ছে। পদোন্নতিযোগ্যদের পদোন্নতি দিতে এ ক্যাডারের বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সভা ডাকা হয়েছে। সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দিতে সভা অনুষ্ঠিত হবে। অধ্যাপক পদে গত বছর পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। জানা যায়, সহযোগী অধ্যাপক পদে এবার বিসিএসের ২২, ২৩, ২৪, ২৫ ও ২৬তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের বিবেচনা করা হচ্ছে। ২২ থেকে ২৬তম ব্যাচ পর্যন্ত এই পদে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তা ৩ হাজার ৩০৩ জন। সহকারী অধ্যাপক পদে বিসিএসের ২৯, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৩৩তম ব্যাচের কর্মকর্তারা বিবেচনায় আছেন। তাদের মধ্যে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তার সংখ্যা মোট ২ হাজার ৪০৮। এ দুটি পদে সর্বশেষ ২০১৮ সালের অক্টোবরে পদোন্নতি দেওয়া হয়। জানা গেছে, বিসিএস শিক্ষা ছাড়া অন্যান্য ক্যাডারে ২৯তম বিসিএসে যোগদান করা ব্যক্তিরা পদোন্নতি পেয়েছেন এবং আরেক দফা পদোন্নতির অপেক্ষা করছেন। অথচ শিক্ষা ক্যাডারে ১০ বছর পার করে এখনো এন্ট্রি পদে কাজ করে যাচ্ছেন।

২৮তম বিসিএসের সব বিষয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতি হয়েছে, হয়নি শুধু গণিত বিভাগের। অন্যান্য ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি হয় আর শিক্ষায় হয় বিষয়ভিত্তিক। সব ক্যাডারে একই রকম হতে হবে তা নয়। তবে নিয়ম এমনভাবে করা উচিত, যাতে কোনো ক্যাডারই পেছনে পড়ে না থাকে এবং হতাশাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। শিক্ষা ক্যাডারে বর্তমানে হাজার হাজার কর্মকর্তা পদোন্নতির সব যোগ্যতা অর্জন করে বসে আছেন, অথচ তাদের পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

শিক্ষা ক্যাডারে সবচেয়ে বেশি দিন থাকতে হয় প্রভাষক পদে। বছরের পর বছর ধরে থাকতে হয়, যা মানসিক যন্ত্রণার কারণ। শিক্ষা ক্যাডার বিসিএস ২৮তম ব্যাচে যোগ দেয় ২০১০ সালে। এই ব্যাচের গণিতের কর্মকর্তারা ১১ বছর ধরে প্রভাষকের পদে পড়ে আছেন। ২৯তম বিসিএসে ৬৫১ জন কর্মকর্তা যোগদান করেন ২০১১ সালের আগস্ট মাসে। এই ব্যাচেও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মকর্তা পদোন্নতি-বঞ্চনা নিয়ে ১০ বছর ধরে প্রভাষক পদে আছেন। ৩০তম বিসিএসের ৫৫২ জন কর্মকর্তা ২০১২ সালের জুন মাসে শিক্ষা ক্যাডারে যোগদান করেন। এই ব্যাচের অর্ধেকেরও বেশি কর্মকর্তা ৯ বছর যাবত্ একই পদে আছেন। বিসিএস ৩১তম ব্যাচের ৪৩৪ জন কর্মকর্তা ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন। তাদের মধ্যে ২০১৮ সালের সর্বশেষ পদোন্নতিতে ৬৩ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি হয়, বাকি সবাই দীর্ঘ আট বছর একই পদে আছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-সন্ততি, নারী ও উপজাতিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত ৩২তম বিসিএসের ৬৫১ জন সদস্য শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন ২০১৩ সালের অক্টোবরে। তারাও প্রায় আট বছর যাবত্ পদোন্নতি-বঞ্চনা নিয়ে প্রভাষক পদে আছেন।

এ তো গেল ভাগ্যবান শিক্ষকদের কথা। বেসরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষকদের কী অবস্থা? তাদের বঞ্চনার তো শেষ নেই। ২০২১ সালে প্রকাশিত হয়েছে নতুন এমপিও নীতিমালা, যেখানে ডিগ্রি কলেজের প্রভাষকদের জন্য ১০০ নম্বরের বিভিন্ন মানদণ্ড বা সূচকের ভিত্তিতে ৫০ শতাংশ পদোন্নতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঐ সূচকগুলোর মধ্যে এমফিল কিংবা পিএইচডির জন্য ৫ এবং জার্নালে প্রবন্ধের জন্য ১০ নম্বর রাখা হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। তবে উচ্চমাধ্যমিক কলেজের প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপক পদ কেড়ে নিয়ে তাদের সিনিয়র প্রভাষক হিসেবে নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি কলেজে করা হয়নি। আবার দীর্ঘদিন ধরে সহকারী অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত থাকা ডিগ্রি কলেজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও এমফিল বা পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষকেরা এমপিও নীতিমালায় জাতীয় শিক্ষানীতির কৌশল মোতাবেক সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাবেন না। এ কেমন কথা? এমপিও নীতিমালা ২০১০-এ এমপিওভুক্ত ডিগ্রি কলেজে সহযোগী অধ্যাপক পদ সৃষ্টি করা হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০১৮-এর নীতিমালায় তা বাতিল করা হয়। ২০২১-এর নীতিমালায়ও দেখা যায় তা আর করা হয়নি, যদিও অনেক শিক্ষকনেতা বলেছিলেন সংশোধনের কথা। সরকারি-বেসরকারির মধ্যে বৈষম্য কমানো তো দূরের কথা, আরো বাড়ানো হলো।

পদোন্নতির বিষয়টি তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হওয়ার কথা। অন্যান্য ক্যাডারে পারফরম্যান্স দেখে প্রমোশন দেওয়া হয়, পদ না থাকলেও প্রমোশন দেওয়া হয়। কিন্তু শিক্ষকতায় পদ খালি থাকে বছরের পর বছর। এই পরিস্থিতিতে কি কেউ কাজ করতে ভালোবাসবেন? অবশ্যই নয়। তবে শিক্ষকদের বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে নিতে হবে। আট বছর চাকরি করলেই অটোম্যাটিক কেন সহকারী অধ্যাপক হবেন? ক্লাস পারফরম্যান্স, এসিআর ছাড়াও ক্রিয়েটিভিটি দেখানোর একটি রেকর্ড থাকতে হবে। দেশে এত শিক্ষক সংগঠন আছে, অথচ পেশাগত উন্নয়নের জন্য কোনো প্ল্যাটফরম নেই। কোনো শিক্ষক সংগঠন আন্তর্জাতিক দূরে থাক, জাতীয় মানেরও কোনো জার্নাল বের করেন না। বিষয়ভিত্তিক জার্নাল থাকলে সেখানে শিক্ষকগণ নিজেদের গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করতে পারতেন, একে অপরের চিন্তাধারা জানতে পারতেন, এতে তাদের ক্রিয়েটিভিটির চর্চা হতো। মোটামুটি সবাই পড়াশোনা ও গবেষণার মধ্যে থাকতে পারতেন। আমরা মনে করি, শিক্ষকগণ শুধু শিক্ষা বোর্ডের কন্ট্রোলার আর চেয়ারম্যানই হবেন না, শুধু মাউশির ডিজিই হবেন না, শিক্ষকদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করতে হবে। শিক্ষকদের সে ধরনের পারফরম্যান্স দেখাতে হবে, প্রস্তুত হতে হবে।

n লেখক : প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)