শিরদাঁড়া সোজা হোক বাঙালির

আপডেট : ২৬ মে ২০২১, ২০:৫৭

পৃথিবীর দুটি দেশে বাঙালির বসবাস। বাংলাদেশের প্রায় পুরোটাই বাঙালি অধ্যুষিত হলেও ভারতের শুধু পশ্চিমবঙ্গে বাঙালির বসবাস। পৃথিবীর বাঙালিপাড়ায় একটা সামাজিক যুদ্ধ চলছে। আমরা চাই আর না চাই, নিশ্চিতভাবে একটি সামাজিক যুদ্ধে আমরা ঢুকে পড়েছি। এ যুদ্ধ বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার।  এ যুদ্ধটা ঠিক হঠাত্ করেই আসেনি। তিন-চার দশক ধরেই যুদ্ধটা চলছে। এদিক থেকে বাংলাদেশের বাঙালি সৌভাগ্যবান বটে। কেননা, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় দীর্ঘদিন ধরেই বাঙালিয়ানায় প্রভাবিত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যমান আছে। এই দুই বাঙালিপ্রধান অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় বা সরকারি ব্যবস্থা যা-ই থাকুক, সামাজিক অঙ্গনে যুদ্ধংদেহি রব বহু বছর ধরেই বয়ে চলছে।

শিরদাঁড়া বড় বেশি বিপজ্জনক অঙ্গ; সব সময় সোজা থাকার প্রয়াস চালায়। বাঙালি কি সেই শিরদাঁড়া সোজা করে রাখতে পারছে প্রতিকূল সামাজিক আর রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যেও? নাকি তুলতুলে হয়ে আছে, যেন ভিনদেহ ভাবনায় প্রতিস্থাপিত হতে পারে? বাঙালির তেমন অবস্থান আর ভিন ট্র্যাডিশন কি যুগল মিলনের ক্ষেত্র বিস্তার করে ফেলেছে ইতিমধ্যে? ‘বাঙালি’ শব্দটি অত্যন্ত সম্মানজনক, যাতে লুকিয়ে আছে জাতিসত্তার স্বয়ংসম্পূর্ণতার চিহ্ন—তা কি আজ পূর্বের ঘটনা মাত্র? এখনো নিশ্চিতভাবে দেওয়া যাচ্ছে না এতসব উত্তর। হয়তো-বা, হয়তো-বা নয়। ‘জানি-জানি’ একটা ভাব ঠিকই আছে বৃহত্তর বাঙালির মাঝে। কিন্তু কোথায় যেন গরমিল মনে হয়। নির্দ্বিধায় কেউ কেউ নির্ভেজাল মিথ্যাটাও বলে যাচ্ছে। কেউ কেউ ‘জানি-জানি’ বলে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করে বসছে। তারা ভালোভাবে বুঝতেই পারে না পেশা, নেশা, ইতিহাস, জীবন ইত্যাদি বহন করে চলে একটি বিশেষ ঢং। আমাদের ঢংটি হলো বাঙালিপনা। ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তেমনি সত্য আমরা বাঙালি’—পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রক্তচক্ষুর সামনে দাঁড়িয়ে এভাবেই এক সাহসী বাক্যে একদিন আত্মপরিচয় ঘোষণা করেছিলেন বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। সেই সত্য ভাষণ আর দৃঢ় মনোবলে আমরা যে বাঙালি তা বলার মানুষের সংখ্যা কি আমাদের মধ্যে কমে যাচ্ছে? বাঙালি মন্দির নিয়ে, মসজিদ নিয়ে লড়াই করতে জানে না। ধর্মস্থানকে রাজনীতি বা সমাজনীতির অঙ্গন ভাবতে পারে না বাঙালির বাঙালিত্ব। বাঙালির চিরায়ত সত্য ভাষণ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। গ্রহণশীলতা আর গ্রহণযোগ্যতা বাঙালির চিরায়ত ভাবাবেগের সঙ্গী। স্বচ্ছ অনুভূতির মতো উদার-অন্তহীন তার বিস্তৃতি। তার দিগন্ত নেই, কালের মাত্রা নেই—নেই সাম্প্রদায়িক ক্ষুদ্রতার নির্বোধ মানচিত্রায়ণ। কিন্তু বাঙালির সেই আকাশকে, সত্তার বিশিষ্ট সংজ্ঞাকে কেউ কেউ বিভাজিত ও কলুষিত করতে উদ্যত। সেই সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়তে পাঁয়তারা করছে। বাংলাদেশ ও ভারতে তাদের পরিচয় ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য একই।

ভারতবর্ষের ব্রিটিশ শাসনামলে নেতাজি সুভাষ বসুর ফরওয়ার্ড ব্লকের বাহিনী ভেঙে দিয়েছিল সে সময়ের হিন্দু মহাসভা। সুভাষ বাহিনী নির্মম ছিল সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতি। সেদিন সুভাষ বসু জোর গলায় বলতে পেরেছিলেন—হিন্দু মহাসভা কিংবা মুসলিম লীগের মতো সাম্প্রদায়িক সংগঠনের কোনো জায়গা হবে না ভারতবর্ষে। ভারতবর্ষ দূরে থাক, আজ তো সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলো বাংলার ঘরে ঘরে প্রবেশ করে বসে আছে। খাদ্যাভাব, বেকারত্ব, মৃত্যুর হার, স্বাস্থ্যহীনতা, শিক্ষার অভাব—মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমান-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ সবারই স্বার্থ অভিন্ন। কিন্তু মৌলবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতি ঠিক বিপরীত। ভারতের মৌলবাদী রাজনীতিই হোক আর বাংলাদেশের মৌলবাদী সংগঠনই হোক, তাদের আসল উদ্দেশ্য মৌলবাদী মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠা করা। তাদের আসল উদ্দেশ্য রাজনীতিকে দখল করে তাদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘বিধাতা কি তাহাকে এ কথা বলিয়া দিয়াছেন যে, ভারতবর্ষের ইতিহাস হিন্দুর ইতিহাস? হিন্দুর ভারতবর্ষে যখন রাজপুত রাজারা পরস্পর মারামারি-কাটাকাটি করে বীরত্বের আত্মঘাতী অভিযান প্রচার করিতেছিলেন, সেই সময় ভারতবর্ষের সেই বিচ্ছিন্নতার ফাঁক দিয়া মুসলমান এদেশে প্রবেশ করিল, চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল এবং পুরুষানুক্রমে জন্মিয়া ও মরিয়া এদেশের মাটিকে আপন করিয়া লইল।’ বিবেকানন্দ লিখেছেন, ‘আমি মুসলমানদের মসজিদে যাইব, খ্রিষ্টানদের গির্জায় প্রবেশ করিয়া ক্রুশবিদ্ধ যিশুর সম্মুখে নতজানু হইব, বৌদ্ধদের বিহারে প্রবেশ করিয়া বুদ্ধেরও তাহার ধর্মের স্মরণ লইব এবং অরণ্যে গমন করিয়া সেইসব হিন্দুর পাশে ধ্যানে মগ্ন হইব, যাহারা সকলের হূদয়-কন্দর-উদ্ভাষণকারী জ্যোতির দর্শনে সচেষ্ট।’ এসবই বাঙালিয়ানার কথা। তাই বাঙালিকেই ঠিক করতে হবে—মৌলবাদী আগ্রাসনের কাছে তারা এতকালের চেনা বাঙালিয়ানাকে ভেসে যেতে দেবে, নাকি স্বাধীনতা বজায় রেখে মাথা উঁচু করে বাঁচবে।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো।’ বিচারের বাণীর মতো সে কথাও বুঝি এখন নীরবে-নিভৃতে কাঁদে। এই বিদ্বেষবিষের গরলে অনেক শিক্ষিত মানুষও এখন মত্ত। এই শিক্ষিত বাঙালির মধ্যে দেখতে পাই দুটি ভাগ। একশ্রেণির মানুষ মৌলবাদময় ভবিষ্যেক ভয়ের কিছু মনে না করে মনে মনে ভালোভাবেই গ্রহণ করে নিয়েছেন। অন্য আর এক দল আছে, তারা নিজেদের সাম্প্রদায়িক মনে করেন না। কিন্তু তারা ভাবেন, ভবিষ্যতের বিপদ থাকতে পারে বটে; কিন্তু দৈনন্দিন গুন্ডাবাজি, দুর্নীতি, অব্যবস্থা, সিন্ডিকেট ইত্যাদি বন্ধ করাটা আশু প্রয়োজন। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মূল্য দিয়ে যদি দৈনন্দিন জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হয়, তবে তা-ই সই। এই দুই অবস্থান থেকে তৈরি হয়ে গিয়েছে নতুন বাঙালির সংজ্ঞা—‘মুসলিম বাঙালি’ আর ‘হিন্দু বাঙালি’। ফলে এক শ্রেণির কাছে অন্য শ্রেণির ধর্মবিদ্বেষ সৃষ্টি করেছে একটি নতুন ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার উত্স। এটি কিন্তু ধার্মিক সাম্প্রদায়িকতা নয়, এটা মূলত সংখ্যাগুরুত্ববাদী চেতনার সাম্প্রদায়িকতা। ভারত ও বাংলাদেশ দুই দেশেই এর সাক্ষাত্ পাই। এখানে রাস্তা আটকিয়ে বা জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অনুষ্ঠান করার মধ্যে তারা আনন্দ লাভ করে, অন্যদের সমস্যার কথা বিবেচনার মধ্যে নিতে পারে না। এ সংস্কারে সংখ্যালঘুরা এতে জাতিবিদ্বেষের নিন্দা করার সুযোগ শুধু পায়। এক দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু যে ভিন্ন দেশের সংখ্যাগুরু ধর্মীয় সম্প্রদায়, সে কথা বেমালুম ভুলে যায় যখন তারা নিজ দেশে সংখ্যাগুরুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক আচরণ করে। এটা ঠিক বাঙালিয়ানার চেহারা নয়। বাঙালিপনা কাউকে আলাদাভাবে দেখতে শিখেনি কখনো। তার কাছে বাঙালিয়ানার সংজ্ঞা একটিই—সে শুধুই বাঙালি। আর সেখানেই সে মানুষ হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে যেতে পেরেছে।

বাঙালির সম্মিলিত বিশ্বাস, ভিন্নমতসহিষ্ণুতা বহিরাগত নতুন ধারণাকে পরাজিত করতে পারবে তো? একদিন ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। সেদিনও ছিল বাঙালির অস্তিত্ব আর পরিচয়ের সংকট। আজও কি সেই সংকট দূর হয়ে গিয়েছে? স্মৃতি আর ইতিহাসের সমূহ সঞ্চয় নিয়ে আমরি বাংলার স্বরূপকে বিভ্রান্তি আর ফাটল তৈরির বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রয়াসে দাঁড় করানোর প্রয়োজনীয়তা কি আজও নেই? শ্রেণি আর সম্প্রদায়ের আরোপিত সীমা পেরিয়ে বাঙালিয়ানা কি আসতে পারবে মুক্ত পাখা মেলে—এটিই যেন আজকের দিনের অনেক বড় প্রশ্ন। আমরা সব সংশয়ের পাশ কাটিয়ে আবার কবে বাঙালি হয়ে উঠব—তা যেন আজকের দিনের বড় ভাবনা। অনেক অভাব আজ আমাদের চারদিকে। আমরা যে আজ একটি খারাপ সময় পার করছি তা কিন্তু আকাশে-বাতাসে স্পষ্ট। অনেক অভাবের মধ্যে আমাদের সংস্কৃতি এবং সাহিত্যেও অভাবের ছাপ, দৈন্যের ছাপ। তবে এই যে অভাব চলছে, দৈন্য চলছে, না পাওয়ার একটা দোলন হচ্ছে—এটাই বুঝি মৌলবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আগামী দিনের শক্তি। বিপ্লব ধীরগতিতে হলেও তৈরি হচ্ছে। লড়াই শেষে বাঙালির সব চেতনা একদিন মাথা তুলে দাঁড়াবে তো?

n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা