ধরিত্রীর বুকে মানবসভ্যতার গোড়াপত্তন হয় খাদ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করেই। প্রাচীন যুগের যাযাবর মানবজাতি বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে শিকারি জীবনের পরিসমাপ্তি দিয়ে কৃষিযুগের সূচনা করে। সময়ের সঙ্গে পৃথিবীতে মানুষের জনসংখ্যা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে, খাদ্যের উত্পাদনও বেড়েছে সঙ্গে সঙ্গে। আজকের পৃথিবীতে প্রায় ৭৯০ কোটি মানুষ বসবাস করে। খাদ্য উত্পাদন ব্যাপক বৃদ্ধি করা না গেলে ‘উচ্চ জনসংখ্যা’র বর্তমান সভ্যতার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ত অনেক আগেই। কৃষিবিজ্ঞানীদের নানাবিধ উদ্ভাবন এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমান জনমিতি বলছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক জনসংখ্যা প্রায় ১ হাজার কোটিতে পৌঁছাবে। এই বিশাল জনসংখ্যার খাদ্যের সংস্থান জোগানো একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক খাদ্যের চাহিদা বর্তমানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। খাদ্যাভ্যাসেও দেখা দেবে বড়সড় পরিবর্তন, আগামীর দিনগুলোতে মাংস ও দুগ্ধজাত খাবারের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে সব থেকে বেশি। বর্তমান সময়ে যে হারে খাদ্য উত্পাদন করা হচ্ছে, তা যদি বাড়ানো না যায়, সেক্ষেত্রে ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের খাদ্যের জোগান দেওয়াই সম্ভব হবে না।
বিশ্বব্যাপী বর্তমানে চাহিদার তুলনায় প্রায় দেড় গুণ বেশি খাদ্য উত্পাদিত হয়। অর্থাত্, বর্তমানে উত্পাদিত খাদ্য দিয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি মানুষের খাদ্যের চাহিদা জোগান দেওয়া সম্ভব, যদিও বর্তমান জনসংখ্যা হচ্ছে ৭৯০ কোটি। এত উদ্ধৃত উত্পাদন সত্ত্বেও পৃথিবীতে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ৮০ কোটিরও বেশি। সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। ধারণা করা হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ এই হিসাবের সঙ্গে আরো ২০০ কোটি ক্ষুধার্ত মানুষ হিসাবের খাতায় যুক্ত হবে। পর্যাপ্ত খাদ্য উত্পাদন সত্ত্বেও বিশ্ব এখনো ক্ষুধা থেকে মুক্ত না হওয়ার পেছনের সব থেকে বড় কারণ হচ্ছে খাদ্যের ‘অপচয় ও অব্যবস্থাপনা’। ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (এফএও)-এর মতে বিশ্বব্যাপী মোট উত্পাদিত খাদ্যের প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ নষ্ট হয়, যার পরিমাণ প্রায় ১৩০ কোটি টন।
বিশ্বব্যাপী বর্তমানে যেসব পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করা হয় তা আসলে কতখানি টেকসই, তা নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, এক কেজি গম উত্পাদনের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ হাজার ৮২৭ লিটার পানি ব্যবহার করা হয়। বৈশ্বিক মোট গ্রিনহাউজ গ্যাসের ৩০ শতাংশ উত্পাদিত হয় কৃষি থেকে, সুপেয় পানির প্রায় ৭০ শতাংশ খরচ হয় ফসল উত্পাদনের পেছনে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামনের দিনগুলোতে সুপেয় পানির সংকট দেখা দেবে, একই সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে লবণাক্ততা। ক্রমবর্ধমানভাবে কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়া, আবহাওয়ার বিরূপ পরিবর্তন ইত্যাদি আগামী দিনের কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ধারণা করা হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করবে, গ্রামীণ অঞ্চলে জনসংখ্যা কমে যাওয়াও কৃষির জন্য সুখকর হবে না।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা খাদ্যের অপচয় কোনোটিই ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি নয়, আগামী দিনের জন্য বড় ঝুঁকি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। পরিবর্তিত জলবায়ু সামনের দিনগুলোতে কৃষিকে প্রভাবিত করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিশ্বব্যাপী অঞ্চলভেদে বিভিন্ন ফসলের উত্পাদন ৫ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আশার আলো দেখাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ইন্টারনেট অব থিংস, ইমেজ প্রসেসিং, বিগ ডেটা, মেশিন লার্নিংয়ের মতো প্রযুক্তি সামনের দিনগুলোতে কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। ফসলের রোগ নির্ণয়, আগাম বৃষ্টি, বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস, পরিমিত পানির ব্যবহারে ফসল উত্পাদন, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসজনিত নানা রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর সমাধান ইত্যাদি সুফল পাওয়া যাবে প্রযুক্তির আশীর্বাদে। ড্রোন ও স্যাটেলাইট-নির্ভর রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি হয়ে উঠবে কৃষকের চোখ। এ ধরনের প্রযুক্তি ছাড়াও নগর কৃষি বা আরবান এগ্রিকালচার প্রযুক্তিতেও আসবে পরিবর্তনের ছোঁয়া। বর্তমানে অনেক দেশেই ভার্টিক্যাল ফার্মিং জনপ্রিয় হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে জনপ্রিয় হচ্ছে ভাসমান কৃষি। ভবিষ্যতে এ ধরনের সব প্রযুক্তিকে সমন্বয় করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
সময়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত স্পষ্ট হচ্ছে যে, অতীতের শিল্পবিপ্লবের মতো ভবিষ্যতে কৃষিতেও আসতে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কৃষিপ্রযুক্তির নবতর বৈপ্লবিক পরিবর্তন। মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার্থে এই পরিবর্তন একান্তই অত্যাবশ্যক। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এই নতুন দিনের কৃষিকে আমরা কতখানি গ্রহণ করতে পারব? নতুন দিনের কৃষিকে গ্রহণ করার মতো দক্ষতা ও সক্ষমতা আমাদের কৃষকদের রয়েছে কি? এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে এখনই। যথাসময়ে প্রযুক্তিগত বিষয়ে সক্ষমতা বাড়াতে না পারলে আমাদের জন্য আগামীর পৃথিবীতে আঞ্চলিক খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিমুক্ত হওয়া কোনভাবেই সম্ভব হবে না।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
