নিরাপদ মাতৃত্ব নারীর অধিকার

আপডেট : ২৬ মে ২০২১, ২০:৫৮

প্রাকৃতিকভাবে বংশানুক্রম ধারা নারীর ওপর বর্তায় মাতৃত্বের মধ্য দিয়ে। একজন মা বর্ণনাতীত যন্ত্রণা সহ্য করে ১০ মাস ১০ দিন একটি শিশুকে নিজের গর্ভে ধারণ করে পৃথিবীর মুখ দেখান। তারপর পরম যত্নে, স্নেহে, ভালোবাসায় বড় করে তোলেন নিজের নাড়িছেঁড়া সন্তানকে; কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই মায়ের স্বাস্থ্যই নিরাপদ নয়। প্রায়ই শিশু জন্মদানসহ নানাবিধ কারণে মৃত্যুবরণ করছেন অসংখ্য মা। তাই এসব অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর হাত থেকে সবাইকে সচেতন করতে প্রতি বছর ২৮ মে বিশ্ব নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস পালন করা হয়। ১৯৮৭ সাল থেকে মা ও শিশুমৃত্যু রোধ করতে এবং তাদের বিভিন্ন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার বিষয়ে সবাইকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে সব সমস্যা প্রতিরোধকল্পে এই দিবসটি পালন হয়ে আসছে। ১৯৯৭ সালে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন বিষয়টি পর্যালোচনা করে এবং এ কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে। বাংলাদেশে ১৯৯৭ সাল থেকে দিবসটি পালন করা হয়।

নিরাপদ মাতৃত্ব হলো—গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে একজন নারীর জন্য নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত জটিলতার কারণে প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার নারীর মৃত্যু হয় এবং ২৬ লাখ শিশু মৃত জন্ম নেওয়াসহ ৩০ লাখ নবজাতক অকাল মৃত্যুবরণ করে। বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন ৮৩০ জন মা মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫ হাজার ৪৭৫ জন মা এবং প্রতিদিন প্রায় ১৫ জন মা মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে দেশে প্রতি ১ লাখ জীবিত সন্তান জন্ম দিয়ে ১৭২ জন মা মৃত্যুবরণ করেন। মোট মাতৃমৃত্যুর ৭৩ শতাংশই ঘটে প্রসব-পরবর্তী সময়ে। যাদের ৫৬ শতাংশই মারা যায় প্রসবের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। এসব মাতৃমৃত্যুর ৩১ শতাংশই ঘটে রক্তক্ষরণের কারণে। ২৪ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী খিঁচুনি বা অ্যাকলাম্পসিয়া। এছাড়া ৩ শতাংশ মায়ের মৃত্যু ঘটে বাধাগ্রস্ত বা অবিরাম প্রসবব্যথার কারণে। মোট মাতৃমৃত্যুর ৫৩ শতাংশই ঘটে থাকে বাড়িতে প্রসবের কারণে। বর্তমানে ৩৭ শতাংশ মা কমপক্ষে চারটি প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহণ করে থাকেন। দেশে বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার ৪৭ শতাংশ। প্রসবের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রসব-পরবর্তী সেবা গ্রহণের হার ৩২ শতাংশ। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি লাখ নবজাতকের জন্মে মাতৃমৃত্যু ৭০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার।

আমাদের পুরুষশাসিত সমাজের নারীর নিরাপদ প্রসব অধিকার খর্ব হচ্ছে। একজন নারীর নিজের জীবনের ওপর অধিকার রয়েছে। মাতৃত্বের বিষয়ে নারীর নিজস্ব মতামত নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে পারে। একজন নারী কী ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করবেন, আদৌ করবেন কি না, করলেও কতদিন করবেন—এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নরীকে দিতে হবে। নারী কবে সন্তান নেবেন, কতজন সন্তান নিবেন অথবা নেবেন কি না—এসব ক্ষেত্রে স্বাধীনতা প্রদান করতে হবে। একজন গর্ভবতী নারীর রয়েছে গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসবের জন্য যাবতীয় সেবা পাওয়া এবং প্রসব-পরবর্তী সেবা পাওয়ার অধিকার। বাস্তবে নারী এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত। এসব সিদ্ধান্ত বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্বামী অথবা শাশুড়ি নিয়ে থাকেন, যার ফলে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ অথবা অনিরাপদ গর্ভপাতের স্বীকার হচ্ছে। বাল্যবিবাহ, অপরিণত বয়সে সন্তান ধারণ এবং বাড়িতে দাইয়ের হাতে ডেলিভারি করাতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছেন অনেক নারী। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জীবনব্যাপী সমস্যাসহ নবজাতকের মৃত্যু ঘটে।

গর্ভকালীন সেবা এবং সন্তান জন্মের ব্যাপারে নারীর স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারলে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস সার্থক হবে। গর্ভকালীন মাতৃস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা একজন মা এবং সুস্থ শিশুর জন্য আবশ্যক। গর্ভকালীন সময়ে পরিবারের সবাইকে সহানুভূতিশীল হতে হবে। মায়ের গর্ভকালীন এবং প্রসব-পরবর্তী সেবা নিশ্চিতকরণ করতে হবে। গর্ভবতী মায়ের বিপদ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। বেশি বেশি ভিটামিন, মিনারেল ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিতকরণে সচেতন হতে হবে। প্রসবকালীন সময়ে জরুরি অর্থসহ সব ধরনের প্রস্তুতি রাখতে হবে। নিরাপদ প্রসব সুস্থ শিশুর জন্মের পূর্বশর্ত এবং নারীর প্রাপ্য অধিকার।

n লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়