উপকূলে দুর্ভোগে মানুষ

আপডেট : ২৭ মে ২০২১, ২১:৫৯

ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ চলে গেলেও দেশের উপকূলজুড়ে রেখে গেছে তার ক্ষতচিহ্ন। খুলনা, বরগুনা, বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় বহু জায়গায় বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানিতে ডুবে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। কমপক্ষে ২০ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। অর্ধলাখ মাছের ঘের ভেসে গেছে। তলিয়ে গেছে ধানসহ হাজার হাজার হেক্টর ফসলের খেত। পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ। পানির তোড়ে কাঁচাঘর বিধস্ত হওয়ায় অনেক স্থানে হাজার হাজার মানুষ খোলা আকশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অনেক পরিবারের লোকজন রান্না করতে না পারায় তাদেরকে শুকনো খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এদিকে চট্টগ্রামের  সাতকানিয়া ও ভোলার মনপুরায়  গাছের ডাল ভেঙে ও পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া নোয়াখালীর হাতিয়ায় জোয়ারের পানিতে ভেসে নিখোঁজ রয়েছে আরো এক শিশু।

বরিশাল বিভাগে ১৭০ স্থানে বাঁধে ভাঙ্গন

বরিশাল অফিস জানায়, বিভাগের বিভিন্ন নদী তীরের ১২টি পয়েন্টে ৪ দশমিক ১৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে অসংখ্য গ্রাম। এছাড়া ৪৯টি স্পটের ২৪ দশমিক ২০ কিলোমিটার বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেছে। প্রায় ১ হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় সাড়ে ১২ হাজার পুকুর ও ঘের ডুবে ৬৪ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। সবেচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বরগুনা, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলায়।           গতকাল বৃহস্পতিবার এসব তথ্য জানিয়েছেন বরিশালের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. আব্দুর রাজ্জাক । এদিকে গতকালও কীর্তনখোলা নদীর জোয়ারের পানি নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে।

হাতিয়ায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি

হাতিয়া (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার লক্ষাধিক পানিবন্দি মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। কাঁচাঘর বিধস্ত হওয়ায় হাজার হাজার মানুষ খোলা আকশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। গতকাল দুপুরে ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পুনরায় জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় অসহায় পরিবারগুলো আরো ভোগান্তিতে পড়েন। এদিকে বুধবার সন্ধ্যায় হাতিয়া উপজেলার সুখচর ইউনিয়নের দক্ষিন চর আমানুল্ল্যাহ গ্রামের জগলু উদ্দিনের ৭ বছরের শিশু কন্যা লিমা আক্তার জোয়ারের পানিতে ভেসে গেলেও গতকাল পর্যন্ত তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সাতক্ষীরায় ৬০ গ্রাম প্লাবিত 

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান,উপকূলী উপজেলা শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জের দশটি ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ও মত্স্য ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কমপক্ষে ২২টি স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ভেঙে এবং ৩৪ টি স্থানে উপচে পড়া পানিতে জেলার কমপক্ষে ৬০ টি গ্রাম কমবেশি প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে কমপক্ষে সাড়ে চার হাজার মত্স্য ঘের। ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা। জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল বলেন, ইয়াসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বেড়িবাঁধের। এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।

সাতকানিয়া ও মনপুরায় ২ শিশুর মৃত্যু 

সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম)  সংবাদদাতা জানান, বাগানে আম কুড়াতে গিয়ে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্ট  বাতাসে বুধবার গাছের ডাল ভেঙে পড়ে মো.শাহরিয়ার(৬) নামের এক শিশু মারা গেছে। এ ঘটনায়  তার  চাচাতো ভাই  সাড়ে ৫ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আল ফাহিদ তুষার গুরুতর আহত হয়। উপজেলার এওচিয়া ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ড পশ্চিম  গাটিয়াডেঙ্গা নেয়ামত আলী পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে।

মনপুরা (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় ৪ সহস্রাধিক  ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বেড়িবাঁধ ও পাকা সড়ক ভেঙে ১০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।  ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে । হাজির হাট ইউনিয়নের চরফৈজুদ্দিন গ্রামের ৯ নং ওয়ার্ডের মো.  লোকমানের ৫ বছরের কন্যা বাতাসের ধাক্কায় পুকুরে পড়ে মারা গেছে। চরে বসবাসরত পরিবারগুলো খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। বিশুদ্ধ  খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। লোনা পানিতে পুকুর ভরে  গেছে। রান্না-বান্না করতে কষ্ট হচ্ছে।

পিরোজপুরে তলিয়ে গেছে ৫০ গ্রাম

পিরোজপুর অফিস জানায়, জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাতি হচ্ছে। ভরা পূর্ণিমার অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি জেলার বিভিন্ন স্থানের বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। প্রায় ৫০টি গ্রাম তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৫ হাজার পরিবার প্লাবিত হয়েছে। নদী তীরবর্তী চর ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বাসিন্দাদের দুর্ভোগের মধ্যে ফেলেছে। জেলার মঠবাড়িয়া, ভান্ডারিয়া, ইন্দুরকানী, কাউখালী, নাজিরপুর ও সদর উপজেলায় কাঁচা রাস্তার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি মাছের ঘের, ধান, রবি শষ্য ও পানের বরজের ক্ষতি হয়েছে। ভান্ডারিয়ার তেলিখালীতে বেড়িবাঁধের বড় একটি অংশ পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। উপজেলার কয়েক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার ৭ উপজেলায় আবাদকৃত ১৬৭ হেক্টর আউষ ধানের বীজতলা, ৭ হাজার ৩১৮ হেক্টর আবাদী জমি, ১ হাজার ৩৩৫ হেক্টর সবজি ক্ষেত, ১৪১ হেক্টর জমির পানের বরজসহ ২১২ হেক্টর বিভিন্ন রবি শষ্যের ক্ষেত সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ৫৯৬ হেক্টর জলাশয়ের দুই হাজার ১৫৭টি ঘের ও পুকুর তলিয়ে গেছে। প্রায় পাঁচ কোটি ৬০ লাখ টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে মত্স্য চাষীদের।

ইন্দুরকানী (পিরোজপুর) সংবাদাতা জানান, উপজেলায় বেড়িবাঁধ ভেঙে ২১২০ হেক্টর জমির আউশ ধানের ক্ষেত পানিতে ডুবে রয়েছে। এছাড়া ১৫০ হেক্টর জমির নানা ধরণের শাক-সবজির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। ভেসে  গেছে সাত শতাধিক বদ্ধ জলাশয়ের মাছ। এতে ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৬১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকার।

ভান্ডারিয়া (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, পৌর শহরসহ উপজেলার বাকি ছয়টি ইউনিয়নে ১২শ হেক্টর জমির আউশ ধান ও ৩৫০হেক্টর পান বরজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বাঁধ উপচে পানি জমে ভান্ডারিয়া পৌর শহর, চরখালী-পাথরঘাটা আঞ্চলিক মহাসড়কের ইকড়ি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় চলাচল বিঘ্নিত হয়। রেড ক্রিসেন্টের সভাপতি মো. মহিউদ্দিন মহারাজ জানান, আমাদের স্বেচ্ছাসেবক দলের মাধ্যমে শুকনা খাবারসহ ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপির ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভুক্তভোগীদের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়।

শ্যামনগর-কয়রায় ১২ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, জোয়ারের চাপে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে উপকূলীয় রক্ষা বাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। গাবুরা,পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনীসহ ৯ টি ইউনিয়নে প্রায় চল্লিশটি  গ্রাম প্লাবিত হয়। ১৬৫০ হেক্টর মত্স্য খামারে প্রায় ২ হাজার ৫ শতটি চিংড়ি ঘের পানিতে তলিয়ে যায়। আর ৪ হাজার ৫শত কাঁচা ও আধা পাকা ঘরবাড়ি আংশিক ও ২৬৫ টি কাঁচা ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কয়রা (খুলনা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার ৬ টি পয়েন্টের পাউবোর বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে মত্স্য ঘের তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি, ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানিবন্দি অবস্থায় লক্ষধিক মানুষ সিমাহীন কষ্টের মধ্যে দিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সংখ্যা ৭ হাজার। ২১ শ মত্স্য ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মত্স্যখাতে প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। কৃষি ফসল ও গবাদি পশুর ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

বাগেরহাটে ভেসে গেছে ৫ হাজার চিংড়ি ঘের

বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, জেলায় জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে ৫ হাজার চিংড়ি ঘের। এতে প্রায় ৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। চিংড়ি চাষিরা নেট ও পাটা দিয়ে ঘের রক্ষার শেষ চেষ্টা চালাচ্ছেন। রামপাল উপজেলার হুকরা গ্রামের বাসিন্দা মনোরঞ্জন ঢালি বলেন, ‘গতকাল পানিতে আমার ১২ বিঘার তিনটি ঘেরের মধ্যে দুটি পুরোপুরি ভেসে যায়। এতে আমার ৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’