সামাজিক মূল্যবোধের সঠিক মূল্যায়ন ও মানুষের সার্বিক আচার-আচরণকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সামাজিক বিকাশ সম্ভব হয়। অন্যদিকে পরিবর্তনশীল সমাজব্যবস্থায় সমাজকাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটলেও বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব সমাজে সুস্পষ্ট। তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয়। বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী আত্মহত্যাকে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, ভৌগোলিক, সামাজিক বিভিন্ন কারণকে জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছেন। আবার অনেকেই সামাজিক কারণগুলোর মধ্যে সামাজিক সংহতিকেই আত্মহত্যা সংঘটিত হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আত্মহত্যার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বাঁধন দুর্বল হওয়ার কারণে। অর্থাত্ সমাজের অনুশাসনগুলো দুর্বল হয়ে যাওয়াই আত্মহত্যার উল্লেখযোগ্য কারণ।
আত্মহত্যা এখন শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যার মধ্যে আবদ্ধ থাকছে না। এখন এটা বড় একটি সামাজিক ব্যাধি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রিভেন্টিং সুইসাইড :এ সোর্স ফর মিডিয়া প্রফেশনালস ২০১৭ সালের একটি জরিপে উল্লেখ করেছে, প্রতি বছর বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে এবং প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে। অন্যদিকে অনেক জরিপে দেখা যায়, ৫০ বছরে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে ৬০ শতাংশ। সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও এর ব্যাপক প্রবণতা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্যমতে, ২০১৬ সালে সারা দেশে আত্মহত্যা করে ১০ হাজার ৭৪৯ জন। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ছিল ১০ হাজার ২৫৬ জন। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন ২৯ জনের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছে, যাদের অধিকাংশই তরুণ-তরুণী।
২০২১ সালে করোনা পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজব্যবস্থার প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। শুধু সাময়িকভাবে কোনো সমস্যার সমাধান পেতে অনেকেই ছাত্রাবস্থা, বেকার জীবন ছাড়াও নানাবিধ সমস্যা থাকার কারণে আত্মহত্যার মতো ভুল সিদ্ধান্ত খুব সহজেই নিচ্ছে।
ব্যক্তিগত সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো বেড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ডিপ্রেশন, একাকিত্ব শারীরিক অসুস্থতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, কাজের স্বাধীনতা হারানো, অভিমান, জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে না পাওয়া, ভালোবাসার মানুষকে হারানো এবং ধোঁকা খাওয়া আত্মহত্যার জন্য অনেকাংশে দায়ী।
আত্মহত্যা ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত গর্হিত কাজ, কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক মানুষ বিষণ্নতা থেকে এই ভুল পথেই পা বাড়াচ্ছে। পজিটিভ চিন্তাভাবনার আদলে যদি জীবনের পথ চলা যায়, তাহলে জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়। খারাপ সময়গুলোর পরেই ভালো সময়গুলো আসে, তাই জীবনটাকে পাওয়া-না পাওয়ার ছকের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে জীবনযুদ্ধে লড়াই করার জন্য নিজের মধ্যে শক্তি সঞ্চার করতে হবে। জীবনে বেদনা থাকবে, আফসোস থাকবে, দুঃখ থাকবে, থাকবে উত্থান-পতন, থাকবে আনন্দ। আর এই সবকিছু আছে বলেই জীবন এতটা সুন্দর। জীবনের ভালো সময়টাকে গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে খারাপ সময়টাকেও মেনে জীবনের পথ চলতে হবে। জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব পরিহার করে, জীবনের যে পর্যায়েই থাকি না কেন, শুধু ওপরের পর্যায়ের মানুষকে দেখে আফসোস না করে নিচের দিকে তাকাতে হবে। আমাদের ব্যক্তিগত চিন্তা-চেতনাই আমাদের সুন্দর জীবন দিতে পারে।
এছাড়া বিশ্রাম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, বিনোদন, খেলাধুলা, আমাদের কাজের চাপ থেকে সৃষ্ট বিষণ্নতা দূর করতে পারে। টানা কাজের মধ্যে না থেকে মাঝে মাঝে বাইরে ঘুরে আসা, দৈনিক ৮ ঘণ্টা ঘুমানো আমাদের শরীর ও মনকে প্রফুল্ল রাখতে সহায়তা করে। সন্তানদের কাজের ফাঁকে সময় দেওয়া, নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা, দায়িত্ব নিতে শেখাতে হবে, যেন জীবনের কঠিন সময়েও ভেঙে না পড়ে তারা। সন্তান কখনো ভুল করলে তার ভুল শোধরানোর সুযোগ দিয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে, যেন এসব তার জীবনে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি না করে। বিষাদগ্রস্ত মানুষকে তার কাজের জন্য উত্সাহ ও প্রশংসা করতে হবে, যেন সে জীবনযুদ্ধে নিজেকে কখনো একা না মনে করে। তাদের সমস্যা, অভিমান, কষ্টের কথাগুলো শুনতে হবে এবং তার কষ্টের কারণগুলো নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপ পরিহার করতে হবে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিভিন্ন সমাজসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান পরিচালনা করা উচিত। এছাড়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিয়োজিত রাখা দরকার।
আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজব্যবস্থায় রয়েছে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ও কুসংস্কারাচ্ছন্নতা। আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি হয়তো পরিবারে নয়তো বন্ধুমহলের কেউ মানসিক অবসাদে ভুগছেন। তার পরেও আমরা তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চাই না। পরিবারের কেউ বুঝতে পেরে মনোচিকিত্সকের সাহায্য নিলেও নানান উপায়ে সামাজিকভাবে তাদের হেনস্তা করার জন্য তত্পর থাকি। আর এসব কথা চিন্তা করতে করতে আমরা একটি জীবনকে হারিয়ে ফেলি। যেহেতু আত্মহত্যাকে চাইলে আমরা প্রতিরোধ করতে পারি, তাই আধুনিক সমাজব্যবস্থায় বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারেও আমাদের সচেতন হতে হবে।
আত্মহত্যার মতো ভুল সিদ্ধান্ত থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে সর্বদা এবং ব্যক্তিগতভাবে চারপাশের মানুষকে এ বিষয়ে তাদের করণীয় বিষয়ে সচেতন করতে হবে। ‘আমি যাচ্ছি, ভালো থেকো তোমরা’—এরকম চিন্তাজগতে আবদ্ধ না থেকে ‘আমি আছি, ভালো থাকব আমরা’—এই চিন্তা-ভাবনা বিকাশের মাধ্যমে শুরু হোক সবার সুন্দর জীবনের পথচলা।
n লেখক : প্রভাষক, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়
