ইয়াসের প্রভাবে সুন্দরবনে ১০ অফিস ৩৫ ক্যাম্পের ক্ষতি

আপডেট : ২৮ মে ২০২১, ০২:১৮

ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের তাণ্ডবে সুন্দরবনের ১০টি অফিস, ৩৫টি ক্যাম্পের ক্ষতি হয়েছে। এর বাইরে অর্ধশতাধিক পুকুরে লবণ পানি উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ কিছু রাস্তাও। পূর্ব সুন্দরবনে হরিণের চারটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পশ্চিম সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী মৃত্যুর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। খুলনা অফিস, পিরোজপুর অফিস, বাগেরহাট প্রতিনিধি, শরণখোলা সংবাদদাতা ও মঠবাড়িয়া সংবাদদাতার পাঠানো খবর।

খুলনা অফিস: ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের তাণ্ডবের পর সুন্দরবনে ক্ষয়ক্ষতির নিরূপণ কাজ চলছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী সুন্দরবনে ১০টি অফিস, ৩৫টি ক্যাম্প, ১৫টি কাঠের জেটি, অর্ধশতাধিক পুকুর ও বেশ কিছু রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া হরিণের চারটি মৃতদেহ ও দুটি জীবিত হরিণ উদ্ধার করা হয়েছে।

সুন্দরবন বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ও ভরা পূর্ণিমার প্রভাবে সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদী ও খালে পানি বাড়তে থাকে। গত বুধবার সুন্দরবন সংলগ্ন খালে ও এলাকায় পাঁচ-ছয় ফুট পানি বৃদ্ধি পায়। এতে অর্ধশতাধিক পুকুর লবণ পানিতে ডুবে যায়। ঘূর্ণিঝড়ে সুন্দরবনে অবস্থিত ৮৩টি অফিসই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরমধ্যে ১০টি অফিসের চাল উড়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ে অফিসগুলোতে যাতায়াতের রাস্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পূর্ব সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় চারটি হরিণের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া দুটি জীবিত হরিণ উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করা হয়েছে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মাদ বেলায়েত হোসেন জানান, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সুন্দরবনে পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের থেকে পাঁচ-ছয় ফুট বৃদ্ধি পায়। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা গেছে, প্রবল পানির তোড়ে বেশ কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি জেটি, ছয়টি জলযান (ট্রলার), দুটি গোলঘর, একটি ফুট রেইল, একটি ওয়াচ টাওয়ার, চারটি স্টাফ ব্যারাক ও একটি রেস্ট হাউজ রয়েছে। দুটি অফিসের রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাসের মোহসীন হোসেন বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সুন্দরবন খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জের ৫৪টি পুকুরের মধ্যে ৫৩টি পুকুরে লবণ পানি প্রবেশ করে পানি পানের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে খুলনা রেঞ্জে ৩১টি ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ২৩টি পুকুর রয়েছে। এছাড়া ১২টি কাঠের জেটি, কয়রা ও বজবজিয়ায় দুইটি টহল ফাঁড়ি এবং ৩৫টি ক্যাম্প ও স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে হরিণ ও বাঘসহ কোনো পশুপাখির মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।’

সুন্দরবন বন সংরক্ষক (সিএফ-খুলনা সার্কেল) মো. মঈনুদ্দিন খান বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের তাণ্ডবের পর সুন্দরবনে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য সহকারী বন সংরক্ষকদের (এসিএফ) নেতৃত্বে কাজ চলছে। ১৫টি কাঠের জেটি ও ৮৩টি অফিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া হরিণের চারটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।’

পিরোজপুর অফিস, বাগেরহাট প্রতিনিধি এবং শরণখোলা ও মঠবাড়িয়া সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে পূর্ব সুন্দরবনের অবকাঠামোর ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া চারটি মৃত হরিণ পাওয়া গেছে লোকালয়ের নদ নদীতে। বৃহস্পতিবার সকালে বন থেকে জোয়ারে ভেসে লোকালয়ে চলে আসা দুইটি জীবিত হরিণ উদ্ধার করে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে। ঝড়ে বন বিভাগের দুইটি রেস্ট হাউজ, দুইটি অফিস, একটি ব্যারাক, একটি ফুট ট্রেইল, গোলঘর, ১০টি জেটি, ১৫টি রাস্তা, চারটি পুকুর, একটি জলযান ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. জয়নাল আবেদীন জানান, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে সুন্দরবনে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চারটি চিত্রল হরিণের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বুধবার দুপুরে দুবলা থেকে একটি, কচিখালী থেকে একটি, শরণখোলা উপজেলা সদরের বলেশ্বর নদীর রাজেস্বর এলাকা থেকে একটি ও বৃহস্পতিবার সকালে চালরায়েন্দা এলাকা থেকে একটি মৃত হরিণ উদ্ধার করা হয়েছে। মৃত হরিণগুলো সুন্দরবনে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পানির স্রোতে ভেসে পার্শ্ববর্তী মঠবাড়িয়া উপজেলার বেতমোড় ও গোলবুনিয়ার লোকালয়ে চলে যাওয়া দুইটি জীবিত হরিণ উদ্ধার করে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে।

করমজল বণ্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ কবির বলেন, ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ও জোয়ারের পানির প্রভাবে করমজল বণ্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রটি পাঁচ থেকে ছয় ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। প্রজনন কেন্দ্রে কুমিরের সেডগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সুন্দরবন শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, মঠবাড়িয়ার লোকালয়ে উদ্ধারকৃত হরিণ দুটি সুন্দর বনের শরণখোলা রেঞ্জের গহীন বনে অবমুক্ত করা হয়েছে।

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে প্রাথমিকভাবে ৬০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সব অফিসের আওতাধীন বনের গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য সকল বনরক্ষীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

লালমোহন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, ইয়াসের প্রভাবে সাগরের জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে লালমোহনের বিভিন্ন চর থেকে অর্ধশতাধিক মহিষ ভেসে গেছে। স্থানীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের বরাত দিয়ে লালমোহন উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা জানান, উপজেলার ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের অন্তর্গত মেঘনা নদীর মধ্যে অবস্থিত ৮ নম্বর চর থেকে নুরনবী মিয়ার ১০টি, কাঞ্চন মালের ৯টি, জয়নাল মাস্টারের তিনটি, বাদশার চর থেকে শফু গোয়ালের ছয়টি, কাশেম গোয়ালের তিনটি মহিষ পানির সে াতে ভেসে যায়। এছাড়া ৮ নম্বর চর থেকে শিহাব গোয়ালের ১০টি গরু এবং আরজু গোয়ালের আটটি গরু ভেসে যায়। অপরদিকে উপজেলার বদরপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যে অবস্থিত নবীরচর ও খেজুরগাছিয়া চর থেকে কয়েক জন কৃষকের ৩১টি মহিষ ভেসে যায়।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি