উদ্দেশ্য কি পূরণ হইতেছে?

আপডেট : ২৮ মে ২০২১, ২১:১১

আমাদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হইল দারিদ্র্য বিমোচন করা। এই সকল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উন্নয়নের জাল তৈরি করা হয়, যাহাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ঐ জালের মাধ্যমে অন্তত অতিদরিদ্রে পতিত না হয়। কিন্তু এই জাল পাতিবার পরও ইহার মধ্যে কিছু ছিদ্র থাকিয়াই যায়, যাহা দিয়া কিছু দরিদ্র মানুষ পড়িয়া যায় দারিদ্র্যসীমার নিচে। এই কারণে সরকার কিছু প্রকল্পের মাধ্যমে ঐ অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ন্যূনতম উপায়ে বাঁচিবার পথ তৈরি করিয়া দিতে চাহে। অনেকের মতেই ইহা বেশ ভালো একটি প্রচেষ্টা।

এই সকল প্রচেষ্টায় গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সেই সঙ্গে এলাকার উন্নয়ন কর্মসূচি আমরা দেখিতে পাই। টিআর (টেস্ট রিলিফ), কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) প্রভৃতির মাধ্যমে উপজেলা কমিটি প্রাপ্ত বরাদ্দ অনুযায়ী পরিপত্র মোতাবেক ইউনিয়ন কমিটির মাধ্যমে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। তাহার সহিত মাননীয় সংসদ সদস্যদের অনুকূলে বরাদ্দপ্রাপ্ত খাদ্যশস্য কিংবা টাকা সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। এই সকল কর্মসূচির আওতায় কাবিটার মাধ্যমে পুকুর-খাল খনন কিংবা পুনঃখনন, রাস্তা নির্মাণ কিংবা পুনর্নির্মাণ, রাস্তা-বাঁধ নির্মাণ কিংবা পুনর্নির্মাণ, জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য নালা ও সেচনালা খনন কিংবা পুনঃখনন, বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের মাঠে মাটি ভরাট, মাটির কিল্লা  নির্মাণ কিংবা পুনর্নির্মাণ ইত্যাদি কাজের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হইয়া থাকে। টিআরের মাধ্যমে বিগত বত্সরে বাস্তবায়িত কাবিটা প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করা হয়। বাঁধ ও রাস্তা, নালা, নর্দমা খনন কিংবা সংস্কার, ধর্মীয় শিক্ষা-জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান সংস্কার কিংবা মেরামত, স্যানিটারি ল্যাট্রিন, বাঁশের সাঁকো নির্মাণ, বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য এলাকাভিত্তিক গভীর নলকূপ স্থাপন। এই সকল কর্মসূচির প্রকল্পসমূহ প্রকল্প কমিটির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হইয়া থাকে।

প্রশ্ন উঠিতে পারে, এই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যের অনুকূলে এবং উপজেলা পরিষদের অনুকূলে কত টাকা বরাদ্দ হইয়া থাকে। এই ক্ষেত্রে আমরা দক্ষিণাঞ্চলের একটি এলাকার উদাহরণ টানিতে পারি। ঐ এলাকায় ২০২০-২১ অর্থবত্সরে সংসদ সদস্যের অনুকূলে কাবিটা ও টিআর প্রকল্পে সর্বমোট বরাদ্দ হইয়াছে ৪ কোটি ৩৩ লক্ষাধিক টাকা। অন্য দিকে উপজেলা পরিষদের অনুকূলে টিআর ও কাবিটার মোট বরাদ্দ হইয়াছে ৫ কোটি ৭ লক্ষাধিক টাকা। সুতরাং সংসদ সদস্য ও উপজেলা পরিষদের অনুকূলে সর্বমোট বরাদ্দ প্রায় ৯ কোটি ৪১ লক্ষ টাকা। দেশের বিভিন্ন এলাকার অবস্থাভেদে কমবেশি এই ধরনেরই বরাদ্দ হইয়া থাকে। যদিও বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় এই অভিযোগ আমরা প্রায়শই দেখিয়া থাকি যে, টিআর ও কাবিটার বরাদ্দ লইতেও বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির আশ্রয় লওয়া হইতেছে। যেমন, গত বুধবার একটি জাতীয় দৈনিকে বলা হইয়াছে, কিশোরগঞ্জের ভৈরবে এক ইউপি চেয়ারম্যান একই সড়কে একাধিক প্রকল্প দিয়া কাজ শেষ না করিয়াই বরাদ্দের সকল টাকা উত্তোলন করিয়া লইয়াছেন। অর্থাত্ উপজেলায় টিআর, কাবিখা, কাবিটা ও কর্মসৃজন প্রকল্পের কাজ না করিয়াই টাকা  উত্তোলনের অভিযোগ উঠিয়াছে বিভিন্ন সময়। দেখা যাইতেছে, গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের দুর্দশা লাঘবে সরকারের টিআর-কাবিটা কর্মসূচিতে বরাদ্দ অর্থের সিংহভাগই নয়ছয় হয়। অনেকে এই পরিস্থিতিকে এইভাবে বর্ণনা করেন যে, টিআর ও কাবিখার বরাদ্দে উন্নয়নের নামে উপজেলা পর্যায়ে গড়িয়া উঠিয়াছে ‘লুটেখা’ সিন্ডিকেট।

নিশ্চয়ই সকল উপজেলার অবস্থা এত খারাপ নহে। কোথাও কোথাও যতটা সম্ভব নিয়মমতো কাজও হয় নিশ্চয়ই। কিন্তু তাহার পরও অনেকে মনে করেন, টিআর, কাবিখা, ওএমএস—এইগুলি প্রয়োজনীয় গণমুখী কর্মসূচি বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বহুলাংশে ব্যর্থ হইতেছে। অপচয় হইতেছে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ। এই ক্ষেত্রে অনেকে মনে করেন, এই টাকা দিয়া কিছু লোভী মানুষের মুখ বন্ধের ব্যবস্থা না করিয়া একটা একটা করিয়া দারিদ্র্য বিমোচনের জালের ছিদ্র বন্ধ করিবার ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।