নির্মমতার দীর্ঘছায়া

আপডেট : ২৮ মে ২০২১, ২১:১২

১৬ মে রাজধানীর পল্লবীতে সন্তানের সামনে বাবাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি শুধু বীভত্সতাই নয়, নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিও ফের সামনে নিয়ে এসেছে। পল্লবীর ডি-ব্লকের ৩১ নম্বর সড়কে সাহিনুদ্দীনকে টেলিফোনে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা ফিল্মি কায়দাকেও হার মানিয়েছে। ঐ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব (সাবেক) এম আবদুল আউয়ালের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নৃশংসতার শিকার সাহিনুদ্দীনের ১০ একর জমির ওপর ‘শ্যেনদৃষ্টি’ পড়েছিল আবাসন প্রকল্পের কর্ণধার এম এ আউয়ালের। সাহিনুদ্দীনের এ জমিটুকু দখলে নেওয়ার জন্য তার বিরুদ্ধে এম এ আউয়াল চাঁদাবাজির মামলা করেছিলেন এবং তাকে এজন্য কারাগারেও যেতে হয়েছিল। সম্প্রতি ঐ চাঁদাবাজির মামলায় সাহিনুদ্দীন জামিনে মুক্ত হওয়ার কদিন পরই এই নৃশংস ঘটনা ঘটল!

আমাদের অনেকেরই মনে আছে, ২০১৯ সালে বরগুনায় শাহনেওয়াজ রিফাতকে একইভাবে প্রকাশ্যে খুনিরা কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, উল্লিখিত ঘটনাগুলো কি শুধুই মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিরূপ ফল? এসব ঘটনার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে কি নষ্ট রাজনীতির বিরূপ ছায়াও নেই? এ রকম অনেক প্রশ্নের উত্তরই জটিল কিছু নয়। কিছুদিন আগে জাতীয় সংসদের একজন সদস্য মানব পাচারের দায়ে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশের আদালতে দণ্ডিত হয়ে সেখানে কারাবাস করছেন। সাবেক সংসদ সদস্য এম এ আউয়ালের নির্দেশে সাহিনুদ্দীন হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে আরো কিছু প্রশ্ন নিয়ে এসেছে। ধারাবাহিক প্রশ্ন হচ্ছে, এম এ আউয়াল কি এক দিনে এ পর্যায়ে গেছেন? একজন সাবেক সদস্য ভাড়াটে কিংবা তার লালিত-পালিত সন্ত্রাসী চক্রকে দিয়ে কীভাবে এমন পৈশাচিক ঘটনা ঘটানোর দুঃসাহস দেখান? ঐ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি যুক্তরা প্রকাশ্যে সাহিনুদ্দীনকে কুপিয়ে হত্যা করে টেলিফোনে এম এ আউয়ালকে নিশ্চিত করেছিল, ‘স্যার, ফিনিশ!’ সাহিনুদ্দীন বা রিফাত কিংবা নুসরাত হত্যা—এ রকম অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে খুনিদের সীমাহীন ঔদ্ধত্য, সামাজিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক ব্যাধির ভয়ংকর যে চিত্র ক্ষণে ক্ষণে ফুটে উঠছে তাতে জননিরাপত্তা কতটা প্রশ্নবিদ্ধ, এ বিষয়টি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন রাখে কি?

যখন দিনে দিনে সমাজে কারো না কারোর কিংবা নিজেদের শক্তিবলে এভাবে তারা বেড়ে উঠছিল, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনিক দায়িত্বশীলরা কী করছিলেন? যে কোনো হত্যাকাণ্ড বা অপরাধ-পরবর্তী অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা, রিমান্ডে নেওয়া এসবের চেয়ে এমন ভয়ংকর অপরাধ সংঘটনের আগে প্রতিকার-প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াটাই কি উপযুক্ত কাজ নয়?

সাহিনুদ্দীন হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা এম এ আউয়ালসহ কয়েক জনকে এরই মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম আসামি মানিক ও মনির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুততার সঙ্গে সাহিনুদ্দীন হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা এম এ আউয়ালসহ কয়েক জন আসামিকে গ্রেফতার করে নিশ্চয়ই সাধুবাদযোগ্য কাজ করেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে সুশাসন, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ জনদাবি উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত হলেও এসবের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত চিত্র সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক প্রচেষ্টার পরও কাঙ্ক্ষিত মাত্রা লাভ করেনি। তবে আমরা আশাবাদী, আজ না হলেও কাল জনপ্রত্যাশা পূরণ হবে।

বহুমাত্রিক কুসম্পর্কের সম্পৃক্ততা, দুর্নীতি-অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা সমাজে-রাষ্ট্রে কী রকম কালো ছায়া ফেলছে, উল্লিখিত ঘটনাগুলো এরই খণ্ডিত দৃষ্টান্ত মাত্র। এই রাষ্ট্রের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে স্বঘোষিত খুনিরা আইনি পন্থায় দায়মুক্তি পেয়েছিল। এমতাবস্থায় এদেশ কি এত সহজে কদাচারমুক্ত হবে? মাঝে মাঝে এমন হতাশায় ভুগি। একই সঙ্গে আমাদের সামনে এমন দৃষ্টান্ত অনেক আছে, হত্যাকাণ্ড কিংবা অপরাধের হোতারা অনেক ক্ষেত্রেই কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যায়। সমাজে তোলপাড় করা কিছু ঘটনার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও দীর্ঘ মেয়াদে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় অপ্রত্যাশিত কত কিছু। সচেতন জনমনে কিংবা অভিজ্ঞতায় এও আছে, অভিযুক্তদের আইনের আওতায় নেওয়া হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনভাবে আইনি প্রক্রিয়া সাজানো হয়, যাতে অভিযুক্তরা উপযুক্ত শাস্তি না পায়। ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’র এমন চিত্রও নতুন কিছু নয়। আর এ কারণেই অনেকের মধ্যে আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা ও হতাশাও পরিলক্ষিত হয়। এই চিত্র জিইয়ে রেখে জননিরাপত্তামূলক কিংবা মানবিক সমাজ গঠন নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুরূহ।

সমাজে মানুষ যখন অন্যায়, অনাচার, অব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করার শক্তি ও সাহস হারিয়ে ফেলে, তখন সমাজের সর্বস্তরে বিপজ্জনক অনেক চিহ্নই ফুটে ওঠে। উল্লিখিত ঘটনাগুলো সাম্প্রতিক কালের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও হূদয়বিদারক, রোমহর্ষক এমন ঘটনা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়ে ঘটেই চলেছে। সমাজের সব সদস্যকে সমান ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং সহজ ও মর্যাদার স্বীকৃতিগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক অবক্ষয়ের পথ রুদ্ধ করতে করণীয় বিষয়গুলো নিশ্চিত করার দায় যাদের, তাদের দায়বদ্ধতাও নিশ্চিত হতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। তা না হলে পৈশাচিকতা-বর্বরতাসহ বহুমাত্রিক অপরাধের ছায়া সরানো যাবে না।

n লেখক :নিবন্ধকার