ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের ক্ষত এখনো শুকায়নি। এর মধ্যে ‘ইয়াস’ ঝাপটা মেরে গেছে। গত দেড় দশক ধরে ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বারবার উপকূল এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূল অঞ্চলের মানুষের সুরক্ষা নির্ভর করে বেড়িবাঁধের ওপরে। দুর্যোগে এই বাঁধ তাদের ভরসা। বাঁধ ভেঙে গেলে তাদের ঘরবাড়ি, ফসলের খেত, রাস্তাসহ সব পানিতে ভেসে যায়। নিঃস্ব হয়ে পড়ে মানুষ। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’-এর প্রভাবে গতকাল বুধবার জোয়ারের পানির চাপে দেশের উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পিরোজপুরসহ উপকূলের ১৪ জেলায় তলিয়ে গেছে অসংখ্য গ্রাম, ফসলি জমি ও মাছের ঘের। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েকলাখ মানুষ।’ (২৭ মে ২০২১)
২০০৮ সালের মে মাসে নার্গিস, ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলা, ২০১৩ সালের ১৬ মে মহাসেন, ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই কোমেন, ২০১৬ সালের ২১ মে রোয়ানু, ২০১৭ সালের ৩০ মে মোরা, ২০১৯ সালের ৩ মে ফণী, ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর বুরবুল, ২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান উপকূলে আছড়ে পড়ে। অম্ফান দেখিয়ে গেছে দুর্বল বেড়িবাঁধের কারণেই মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে। এই এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। তারপর শুধু বাঁধের সংস্কার কাজ হয়েছে। ফলে বেড়িবাঁধ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই এবারো বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়তে সময় লাগেনি। খুলনা জেলার কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, আশাশুনি, বাগেরহাট জেলার শরণখোলা, মোংলার নদীতীর ও বেড়িবাঁধের পাশে প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাস।
কয়রার নিশীথ রঞ্জন মিস্ত্রি জানান, দুর্যোগকবলিত এ জনপদের মানুষ একটির ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে না উঠতেই, ফের নতুন নামে আঘাত হানছে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। এসব ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারিয়েছে বহু মানুষ। জমি ও সম্পদ হারিয়ে অনেকে উদ্বাস্তু। ষাটের দশকে উপকূলীয় এলাকায় নির্মিত বেড়িবাঁধ আম্ফানের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। টিকে থাকার স্বার্থে মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে অনেক জায়গায় রিং-বাঁধ দেয়।
কয়রার হাজতখালী গ্রামের কার্ত্তিক চন্দ্র জানান, ঘূর্ণিঝড় এলেই বাঁধের কদর বাড়ে, ঝড় চলে গেলে বেড়িবাঁধ সুরক্ষার গুরুত্ব ঝিমিয়ে পড়ে। এর ফলে বাঁধগুলি নাজুক হয়ে পড়ছে।
কয়রার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ নুর ইসলাম বলেন, আম্ফানে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় দীর্ঘদিন মানুষকে পানিবন্দি থাকতে হয়েছে। মাত্র ১০ শতাংশের মতো ঘরবাড়ি টিকে ছিল। আইলার পর আড়াই হাজারের মতো পরিবারকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছে।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার অনিমেষ বিশ্বাস মতে, এখানকার বড় সমস্যা পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্বল বেড়িবাঁধ। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হওয়া দরকার।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, দুর্যোগের অন্যান্য বিষয় ছাড়াও লবণের কারণেও বাঁধ টিকছে না। পানিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মাটির কণাগুলো একে অপরের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ঝুরঝুরে হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভাঙন বাড়ছে, বাঁধগুলো টিকছে না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবাধ জোয়ারভাটার (টিআরএম) মাধ্যমে ভূমি উঁচু করা উচিত। পরিশেষে, অতীতে উপকূলের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রকৃতিনির্ভর ও লোকায়ত অনেক প্রক্রিয়া ছিল। কালের বিবর্তনে তা হারিয়ে গেছে, যা খুঁজে বের করা জরুরি।
খুলনা
