কুমিল্লার তিতাস উপজেলার কলাকান্দি ইউনিয়নের হারাকান্দি-কালাচানকান্দি সংযোগ সড়কের মধ্যখানে খালের উপর সোয়া ১৮ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে একটি সেতু নির্মাণ করা হইয়াছে। ২০১৮-১৯ অর্থবত্সরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সেতু/কালভার্ট প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হইয়াছে এই সেতুটি; কিন্তু উদ্বোধনের পূর্বেই নবনির্মিত এই সেতুতে দেখা দিয়াছে ফাটল। ভারি যানবাহন চলাচল শুরু হইলে সেতুটি যে কোনো সময় ভাঙিয়া পড়িতে পারে। জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা সেতুটির নির্মাণকাজে অনিয়ম হইবার বিষয়টি স্বীকার করিয়াছেন। ইহাতে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ তুলিয়াছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা। তাহাদের মধ্যে বিরাজ করিতেছে ক্ষোভ ও হতাশা।
বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনা নূতন নহে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নবনির্মিত সেতু বা স্থাপনা উদ্বোধনের পূর্বেই ভাঙিয়া পড়িবার দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। এমনকি নির্মাণকালেও সরকারি বিভিন্ন স্থাপনার ছাদ ধসিয়া পড়িয়া হতাহতের ঘটনাও ঘটিয়াছে। ইহাকে সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের দায়িত্বহীনতা ছাড়া আর কী-বা বলা যায়। কুমিল্লার এই সেতুর অনিয়মের ঘটনায় ফাইনাল বিল বন্ধ করিয়া দেওয়া উচিত। সেতুটি নির্মাণের সময় যাহাদের পরিদর্শনে যাইবার কথা, তাহারা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন নাই। আমাদের সিস্টেমের কোনো দোষ নাই। দোষ হইল একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর। কোনো সরকারি কাজ করা হইলে ঠিকাদারদের সিকিউরিটি মানি দিতে হয়। এই টাকাও এখন আটকাইয়া দেওয়া প্রয়োজন। এখানে টাকাটা মুখ্য নহে। ইহার কারণে জনগণের যে দুর্ভোগ হইবে তাহাই বড় বিষয়। সরকার বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়, অর্থও দেয়; কিন্তু বিভিন্ন কর্মকর্তার টেবিলে টেবিলে উেকাচ দিতে গিয়া ঠিকাদারদের আর তেমন কিছুই করিবার থাকে না। তখন তাহারা লোহার বদলে বাঁশ দেন। ইট, বালু, খোয়া, সিমেন্ট ইত্যাদিতে অনিয়ম করেন। আমাদের দেশে সেতু নির্মাণের একাধিক কর্তৃপক্ষ রহিয়াছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) পাশাপাশি জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এমনকি ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত এই সকল নির্মাণকাজের সহিত জড়িত। ইহাতে ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার, সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার ও তৃণমূলে সুপারভাইজারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা থাকেন। তাহারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করিলে সদ্যনির্মিত এই সেতুর এমন হতদশা হইবার কথা নহে। বিশেষ করিয়া এলজিইডির বিভিন্ন সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ তুলনামূলকভাবে অধিক। এই আন্তর্জাতিক মান ও খ্যাতিসম্পন্ন সংস্থাটি যাহারা গড়িয়া তুলিয়াছিলেন, তাহারা আজও প্রাতঃস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছেন; কিন্তু এখন যাহারা বিভিন্ন পর্যায়ে ইহার দায়িত্বে আসিতেছেন, তাহাদের উপরির প্রতিই দৃষ্টি অধিক বলিয়া প্রতীয়মান হয়। যে দেশে আজকাল বিবাহশাদিতে সরকারি কর্মকর্তা উপরি কত পান, সেই কথাই পূর্বে জিজ্ঞাসা করা হয়, সেই দেশে প্রকল্পের কাজের মান ভালো হইবে—এমনটি আশা করা বাতুলতা মাত্র।
কনট্রাকটর বা ঠিকাদারও রহিয়াছেন বহু রকমের। যিনি মূল ঠিকাদারের কাজটি পান, তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজটি সাবকনট্রাক্টে দিয়া দেন। এইভাবে কাজটি একাধিকবারও হাতবদল হইতে দেখা যায়; কিন্তু মূল ঠিকাদার হয়তো জানেন না, এত বেচাকেনার পরও দায়দায়িত্ব তাহারই। নিম্নমানের কাজের জন্য তাহাকেই জবাবদিহি করিতে হইবে। তাহার প্রতিষ্ঠানকে ব্ল্যাকলিস্টও করা হইতে পারে। এই জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়িয়া উঠে নাই বলিয়া অনিয়ম ও দুর্নীতি আজ পদে পদে। যাহারা অতন্দ্র প্রহরী তথা জনপ্রতিনিধি ও জনগণ তাহাদের দায়িত্বশীলতা ও সচেতনতার মাত্রা লইয়াও প্রশ্ন আছে। তাহাদের চোখের সম্মুখে কীভাবে অন্যায়-অনিয়ম হয়? অবশ্য জনগণেরও ধৈর্যের সীমা আছে। তাহাদের ক্ষোভ একদিন না একদিন ফাটিয়া পড়িতে বাধ্য। বলা হয় ‘এই দিন দিন নয় আরো দিন আছে...’। আমরা আজ সেই দিনেরই অপেক্ষায় আছি।
