সাভারের আশুলিয়ায় গত শুক্রবার মধ্যরাতে চলন্ত মিনিবাসে এক নারী যাত্রীকে (২২) দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ছয় ধর্ষককে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার বাসটির চালক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বাকি পাঁচ জনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এদিকে ধর্ষণের শিকার নারী গতকাল আশুলিয়া থানায় মামলা করেছেন। পরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার মেডিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়।
এর আগে এই আশুলিয়াতেই চলন্ত বাসের মধ্যে এক কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়। কিশোরগঞ্জেও চলন্ত বাসের মধ্যে ঢাকার একটি হাসপাতালের নার্সকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসের মধ্যে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এক নারীকে ধর্ষণ করা হয়। সর্বশেষ আশুলিয়ায় ধর্ষণের শিকার ঐ নারীর গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাট। তিনি স্বামীর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় থেকে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। গণধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতরা হলো :ঢাকার তুরাগ থানার গুলবাগ ইন্দ্রপুর ভাসমান গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে আরিয়ান (১৮), কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর থানার তারাগুনা এলাকার মৃত আতিয়ারের ছেলে সাজু (২০), বগুড়া জেলার ধুনট থানার খাটিয়ামারী এলাকার সুলতান মিয়ার ছেলে সুমন (২৪), নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানার ধামঘর এলাকার জহুর উদ্দিনের ছেলে মনোয়ার (২৪), বগুড়া জেলার ধুনট থানার খাটিয়ামারী এলাকার তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে সোহাগ (২৫) এবং বগুড়া জেলার ধূপচাচিয়া থানার জিয়ানগর গ্রামের সামছুলের ছেলে সাইফুল ইসলাম (৪০)। তারা সবাই তুরাগ থানার কামারপাড়া ভাসমান এলাকায় ভাড়া থেকে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল-নবীনগর মহাসড়কে মিনিবাস চালাত।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গণধর্ষণের শিকার ঐ নারী নিজ বাসা নারায়ণগঞ্জ থেকে শুক্রবার তার বোনের বাসা মানিকগঞ্জে যান। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নারায়ণগঞ্জের বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে এক স্বজনসহ বাসে উঠলে রাত ৮টার দিকে বাসটি আশুলিয়ার নবীনগর বাসস্ট্যান্ডে তাদের নামিয়ে দেয়। এরপর ঐ নারী রাত ৯টার দিকে নিউ গ্রামবাংলা মিনিবাসের হেলপার মনোয়ার ও সুপারভাইজার সাইফুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে ৩৫ টাকা ভাড়ায় টঙ্গী স্টেশন রোডে যাওয়ার জন্য সঙ্গীকে নিয়ে ঐ মিনিবাসে ওঠেন। তবে মিনিবাসটি গন্তব্যে পৌঁছার আগেই অন্য যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে ভুক্তভোগী ঐ নারী ও তার সহযাত্রীকে না নামিয়ে আবারও নবীনগরের দিকে আসতে থাকে। একপর্যায়ে ঐ বাসের চালক, হেলপারসহ ছয়জন মিলে বাসের জানালা-দরজা আটকে আশুলিয়ার গরুরহাট এলাকায় নিয়ে এসে তাকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। একই সঙ্গে ঐ নারীর সঙ্গী পুরুষ যাত্রীকে মারধর করে বাসের এক কোনায় আটকে রাখে। এ সময় নির্যাতিত নারীর চিত্কারে ঐ স্থানে দায়িত্বে থাকা টহল পুলিশ শুক্রবার রাত ১২টার দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিশমাইল এলাকার ডিসি নার্সারির সামনে ব্যাড়িকেড দিয়ে গাড়িটি আটকায় এবং ধর্ষণকারীদের গ্রেপ্তার করে।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান জানান, শুক্রবার রাতেই অভিযুক্তদের আটক করা হয়। গণধর্ষণের শিকার ঐ নারীর দায়ের করা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠালে আদালত পাঁচ জনের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। আর বাসচালক সুমন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পরে ভুক্তভোগী নারীকে শারীরিক পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ঐ তরুণীর মেডিক্যাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। শনিবার দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে তার মেডিক্যাল পরীক্ষা হয়। হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সেলিম রেজা বলেন, ভুক্তভোগী নারীর শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হতে এবং অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
এর আগে গত বছরের ১৩ জুলাই আশুলিয়ায় চলন্ত বাসে এক কিশোরীকে (১৭) গণধর্ষণ করা হয়। পুলিশ জানায়, ঐ কিশোরী আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকা থেকে ‘আশুলিয়া ক্লাসিক পরিবহন’ নামের একটি বাসে পল্লী বিদ্যুত্ এলাকায় আসার জন্য ওঠে। বাসচালক পল্লী বিদ্যুত্ এলাকায় না গিয়ে মহাসড়কের পাশে একটি জায়গায় নিয়ে যায় এবং দুই সহযোগীসহ ঐ কিশোরীকে ধর্ষণ করে। ঐ কিশোরী চলন্ত বাস থেকে চিত্কার করলে মহাসড়কে দায়িত্বরত আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুদীপ কুমার ঘোষ তা শুনতে পান। পরে তিনি বাসটি আটক ও কিশোরীকে উদ্ধার করেন। বাসচালক আনিছসহ সাত জনকে আটক করা হয়।
কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইলেও চলন্ত বাসে ধর্ষণ :২০১৯ সালের ৭ মে কিশোরগঞ্জে চলন্ত বাসে এক নার্সকে ধর্ষণের পর হত্যা করে চালক ও সহকারী। ঐ দিন বিকালে ঢাকার মহাখালী থেকে স্বর্ণলতা পরিবহনের একটি বাসে করে কটিয়াদিতে ফেরার পথে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। নিহত ঐ নারীর (২৩) বাড়ি কটিয়াদি উপজেলার লোহাজুড়ি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামে। ঢাকায় ইবনে সিনা হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি।
এছাড়া ২০১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে এক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী তরুণীকে দলবেঁধে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় বাসটির চালকের সহকারী নাজমুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর বছরখানেক আগে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে সিরাজগঞ্জের এক তরুণীকে দলবেঁধে ধর্ষণ শেষে হত্যার ঘটনা ঘটে।
আশুলিয়ায় চলন্ত মিনিবাসে এক নারী যাত্রীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার ছয় আসামি —ইত্তেফাক
