মানবজাতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বার্ধক্য। কিন্তু বাস্তবতা এবং চরম সত্যটা হলো বেঁচে থাকলে বার্ধক্যের সাধ সবাইকে গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু আমরা কেউই এ বাস্তব সত্যটাকে মেনে নিতে চাই না। সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে ভয় পাই। আজ যারা নবীন সময়ের পরিক্রমায় একদিন তারাও প্রবীণ হয়ে যাবে। কিন্তু এই বাস্তবতাকে মনে স্থান দেয় না বলেই প্রবীণদের তারা অবহেলার চোখে দেখে। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ প্রবীণ। এই দেশ এবং সমাজের জন্য যারা একসময় অবদান রেখেছেন, দেশের অর্থনীতিকে বর্তমান অবস্থানে নিয়ে আসার পেছনে যারা তাদের জীবন যৌবন উত্সর্গ করেছেন, আজ যেন তারা অপাঙক্তেয়। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি তথা চিকিত্সা শাস্ত্রের উন্নয়নের ফলে আমাদের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় একদিকে শিশু মৃত্যুর হার কমছে অন্যদিকে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। বিশ্বে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১০০ কোটিতে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে এ সংখ্যা এখন প্রায় দেড় কোটি। বাংলাদেশের মতো দরিদ্রপ্রবণ দেশে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থানসহ বিভিন্ন সমস্যায় প্রবীণরা প্রতিনিয়ত জর্জরিত হচ্ছে। করোনাকালীন এ সময়টাতে প্রবীণদের দুরবস্থা সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে পুরুষ প্রবীণদের চেয়ে প্রবীণ নারীরা দুঃখ-কষ্ট, বৈষম্য, বিড়ম্বনার শিকার হন বেশি। সামাজিক ও পারিবারিক কারণে প্রবীণ নারীরা অর্থসম্পদহীন হওয়ায় শেষ জীবনে বিড়ম্বনার শিকার হন। দেশের শ্রমবাজারে নারীর সংখ্যা এমনিতেই কম। তার ওপর করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়ায় এ সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরকার করোনাকালীন সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও তা যথাযথভাবে বিলিবণ্টন হচ্ছে না। পত্রিকান্তরে জানা যায়, ২৩টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৪৩টি সামাজিক কর্মসূচি রয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ কর্মসূচিতে মোট বরাদ্দ ছিল ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী বয়স্ক ভাতার তালিকায় এ অনিয়মের হার ৪৬ শতাংশ। এসব কর্মসূচির সহায়তা সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে পারলে কোনো বাড়তি ব্যয় ছাড়াই আরো ২৬ লাখ পরিবারের ১ কোটি ৭ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচ থেকে তুলে আনা সম্ভব হতো। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচিতে। বয়স্ক ভাতা পেতে হলে পুরুষদের বয়স কমপক্ষে ৬৫ এবং নারীদের বয়স ৬২ বছর হওয়ার কথা থাকলেও তা যথাযথ মানা হচ্ছে না। তাছাড়া এই ভাতা পেতে হলে বাত্সরিক আয়ের পরিমাণ ১০ হাজার টাকার কম হতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এর বেশি আয়ের লোকেরাও এ ভাতা নিচ্ছে। শুধু তাই নয়, অধিকাংশ উপজেলা চেয়ারম্যান, মেম্বার মৃত মানুষকে জীবিত দেখিয়ে, স্বামী জীবিত থাকলেও বিধবা দেখিয়ে, স্বজনপ্রীতি করে অর্থ আত্মসাত্ করে এ কর্মসূচি পরিচালনা করছে। প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বয়স্ক ভাতার শর্ত পূরণ করে না ৫৯ শতাংশ, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীত মহিলা ভাতায় ভূমিহীন শর্ত পূরণ করে না ২৩ শতাংশ, দরিদ্র না হয়েও ত্রাণ পায় ৫৬ শতাংশ, ভিজিডির ক্ষেত্রে সামান্য ভূমিহীন বা ভূমিহীন অধিকারী হওয়ার শর্ত পূরণ করে না ৪৭ শতাংশ এবং ভিজিএফে ভূমির শর্ত পূরণ করে না ৫৪ শতাংশ। এই চিত্র থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয় সরকারের এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন যারা করছে তাদের সততা এবং আন্তরিকতা কতটুকু। কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রমগুলো যথাযথভাবে পরিচালনা করা হলে এসব অনিয়ম কিছুটা হলেও কম হতো।
আমাদের দেশে একটা বিরাট সরকারি-বেসরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মজীবী জনগোষ্ঠী রয়েছে যাদের অবসর গ্রহণের পর আর কিছুই করার থাকে না। পরিবারের জীবনজীবিকা নির্বাহের জন্য তাদের মধ্যে অনেকেই সারা জীবনের সঞ্চয়ের বা বলা যায় চাকরিতে জমানো আয়ের একটি অংশ দিয়ে সঞ্চয়পত্র ক্রয় করে থাকেন। এটাই অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ নর-নারীদের আর্থিক সক্ষমতার উত্স। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সরকার প্রবীণ /বয়স্কদের জন্য ভাতা প্রদান করলেও প্রবীণদের সঞ্চয়ের এ মুনাফা থেকে বিগত দুই অর্থবছর থেকে ৫ শতাংশ হারে মুনাফার কর কেটে রাখা হচ্ছে। এ নিয়ে বহু আবেদন-নিবেদন জানানো হলেও সরকার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না বা বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছে না যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অমানবিকও বটে। শুধু তাই নয়, বর্তমান সরকার জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩ এবং পিতামাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩ পাশ করলেও ২০২১ সালে এসেও আমরা এর যথাযথ বাস্তবায়ন দেখছি না। এ নীতিমালা সম্পর্কে অনেকে জানেনই না। এই বিষয়টি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে অনেক আইন আছে কিন্তু তার যথাযথ প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন নেই। দেড় কোটি প্রবীণের জন্য সরকারি পর্যায়ে আধুনিক মানসম্পন্ন তেমন কোনো নিবাস নেই। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য ব্যাংক, বিমা, অফিস আদালত, বাস, ট্রেন, হাসপাতালসহ কোথাও হ্রাসকৃত হারে বা আলাদা কোনো সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা নেই। এসব নিয়ে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বহু লেখালেখি, আবেদন, নিবেদন জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি বা হচ্ছে না। অথচ বর্তমান সরকারে বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা আছেন তাদের অধিকাংশই প্রবীণ/প্রবীণা। তারপরও প্রবীণদের নিয়ে তারা তেমনভাবে ভাবেন না। আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকার প্রবীণবান্ধব সরকার তাই আসছে বাজেটে প্রবীণদের/অবসরপ্রাপ্তদের সঞ্চয়পত্র থেকে কর্তনকৃত কর প্রত্যাহারের পাশাপাশি প্রবীণদের সার্বজনীন ভাতা প্রদান, সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা, সার্বজনীন পেনশন সুবিধা/বয়স্কভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। এর সঙ্গে তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে একদিকে তাদের মেধা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দেশ উপকৃত হবে অন্যদিকে সমাজে প্রবীণদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে। এতে করে তারা পরিবার বা সমাজে অপাঙক্তেও হবে না। তাই আসছে বাজেটে প্রবীণদের জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকলে ভালো হতো। নিশ্চয়ই এ সম্পর্কে নীতিনির্ধারকরা ভেবেছেন বলে আমাদের আশা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রবীণদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো দেখার জন্য নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের অনুরূপ একটি মন্ত্রণালয় গঠন করা এখন সময়ের দাবি। যদি সেটা সম্ভব নাও হয়, তাহলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তর গঠন করা যেতে পারে।
n লেখক :সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক, নির্বাহী সদস্য বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ
