বর্তমান তরুণ-তরুণীদের মনোজগতের বড় একটা অংশ দখল করে নিয়েছে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। অনেক তরুণ-তরুণীই দিনের বেশির ভাগ সময় কাটাচ্ছে এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সৃষ্টি হয়েছিল বিশ্বব্যাপী নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষদের একটি সাধারণ প্ল্যাটফরমে আনার অভিপ্রায়ে, মানুষের একাকিত্ব দূর করার প্রয়াসে। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক মনোবিজ্ঞানীরাই প্রশ্ন তুলেছেন এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যকারিতায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এসব কি আসলেই মানুষের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে একাকিত্ব হ্রাস করে নাকি মানুষকে আরো অসামাজিক করে তুলে একাকিত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ করে? উত্তর পেতে হলে আমাদের এর সঙ্গে জড়িত কয়েকটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে।
মানুষ সামাজিক জীব, একে অন্যের সাহচর্যই মানুষকে ভালো কিছু করার প্রেরণা যোগায়। একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক মানসিক চাপ কমায়, অবসাদ আর দুশ্চিন্তা দূর করে, মানুষকে একাকিত্বের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে। কিন্তু বর্তমান যুগে আমরা পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে ফেসবুক, টুইটারসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের দিকেই বেশি ঝুঁকছি। এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও আমাদের স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে যে ভার্চুয়াল মাধ্যম কখনোই সরাসরি যোগাযোগের বিকল্প হতে পারে না। বরঞ্চ সামাজিকতার ভার্চুয়াল জগতে অধিক সময় কাটানোর ফলে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে দেখা দিতে পারে অনিদ্রা, দুশ্চিন্তা, অবসাদ, ফোমোসহ আরো নানা মানসিক জটিলতা। ফেসবুক অথবা ইনস্টাগ্রামের চকচকে ছবি সৃষ্টি করতে পারে হীনমন্যতা। যদিও আমরা জানি বেশির ভাগ সময়ই ব্যবহারকারী শুধুমাত্র তার জীবনের সাফল্যগাথা আর সুন্দরতম মুহূর্তের ছবিগুলোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে, তবুও অবচেতনভাবেই এই ফিল্টারড পোস্টগুলো বাকিদের মনে তুলনার সূত্রপাত ঘটায় আর হীনমন্যতার সৃষ্টি করে। ২০১৭ সালে রয়্যাল সোসাইটি অব পাবলিক হেলথ ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সি দেড় হাজার কিশোর-কিশোরীর ওপর একটি জরিপ চালায়। এতে দেখা যায়, স্ন্যাপচ্যাট ও ইনস্টাগ্রাম তাদের মনে সবচেয়ে বেশি হীনমন্যতা এবং দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করে। ১০ জনের মধ্যে সাত জন বলেছে, ইনস্টাগ্রামের কারণে তাদের নিজেদের দেহ নিয়ে মন খারাপ হয়েছে। তরুণ-তরুণীদের অর্ধেকই বলেছে, ফেসবুকের কারণে তাদের মানসিক দুশ্চিন্তা ও অশান্তি বেড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর দ্বারা সৃষ্ট অন্য একটি মানসিক সমস্যার নাম হলো “FOMO” বা Fear of Missing Out. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম না থাকলে কোনো বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে অথবা আপটুডেট থাকা যাবে না এই আতঙ্কেই অনেকের মধ্যে মিনিটে মিনিটে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢু মারার প্রবণতার সৃষ্টি হয় যা পরবর্তী সময়ে দুশ্চিন্তা আর অবসাদ বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সম্প্রতি প্রকাশিত পেনসালভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চমাত্রার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা স্ন্যাপচ্যাটের ব্যবহার মানুষের একাকিত্ব কমানোর বদলে বাড়িয়ে দিচ্ছে। মনকে প্রফুল্ল রাখার জন্য দরকার মুখোমুখি যোগাযোগ। মুখোমুখি সাক্ষাতের পরিবর্তে ভার্চুয়াল যোগাযোগকে যত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে, একাকিত্ব, দুশ্চিন্তা আর মানসিক অবসাদ সৃষ্টির প্রবণতা তত বেশি বাড়তে থাকবে। সমীক্ষাগুলোর এহেন নেতিবাচক ফলের কারণে তাহলে কি আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার একেবারে বাদ দিয়ে দেব? ইয়েল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর লরি সান্তোষ বলছেন, ভিন্ন কথা। তার মতে, সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দ্বারা সৃষ্ট ফেইক রিয়েলিটি সম্পর্কে অবগত থাকলে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজেদেরকে সহজেই রক্ষা করতে পারব। তাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুকের পাতায় স্ক্রল বা ছবিতে পড়া লাইককে সামাজিক জনপ্রিয়তার মাপকাঠি না বানিয়ে ফেসবুক আর বাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো পরিমিতভাবে ব্যবহার করতে হবে নিজের কল্যাণ ও সৃজনশীলতার বিকাশে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
