আমাদের দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে রাবারশিল্প ইতিমধ্যে বিশেষ অবদান রাখতে শুরু করেছে। দেশে উত্পাদিত উন্নতমানের রাবার দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। রাবার এমন একটি মূল্যবান অর্থকরী সম্পদ, যার বিভিন্ন ধরনের ব্যবহার রয়েছে। রাবারগাছের কষ (ল্যাটেক্স) থেকে রাবার উত্পন্ন হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ব্রিটিশদের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম রাবার চাষ শুরু হয়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রাবারের চাষ হচ্ছে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের রামু, রাউজান, ডাবুয়া, হলুদিয়া, কাঞ্চননগর, তারাখো, দাঁতমারা, সিলেটের ভাটেরা, সাতগাঁও, রূপাইছড়া, শাহাজীবাজার, টাঙ্গাইলের মধুপুর, শেরপুর, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানসহ বিস্তীর্ণ এলাকা।
বাংলাদেশ রাবার চাষে নবীন হলেও দেশের ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, পরিবেশসহায়ক ও আর্থসামাজিক প্রয়োজনে রাবার চাষের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশে রাবার চাষের মাধ্যমে দ্রুত বনায়ন, বনায়নের মাধ্যমে বিস্তীর্ণ এলাকার ভূমিক্ষয় রোধ, বিপুল কর্মসংস্থান, বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক আয়ের ব্যবস্থাসহ প্রভূত কল্যাণ সাধিত হবে। বাংলাদেশের রাবার চাষকে লাভজনক করা, জনসাধারণের অংশীদারিত্বের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া, রাবারচাষিদের সহযোগিতা প্রদানের জন্য ভবিষ্যত্ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য সরকার ২০১৩ সালে বাংলাদেশ রাবার বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু রাবার চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। রাবার উত্পাদন মূলত কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। ট্যাপিং এলাকা, গাছের ফলন, ট্যাপিংয়ের জন্য কৃষকদের উদ্যোগ ইত্যাদি। সাধারণ একটি গাছের ল্যাটেক্স উত্পাদনে সক্ষমতা অর্জন করার জন্য পাঁচ-ছয় বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। প্রথম দিকে ল্যাটেক্স উত্পাদনের হার কম থাকে। বছরে বছরে এটি বাড়ে। সম্পূর্ণ ফলনপ্রাপ্তির জন্য ১০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় এবং এরপর ২০-৩০ বছর পর্যন্ত ল্যাটেক্স পাওয়া হয়।
রাবার চাষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাবারগাছ পরিবেশবান্ধব। রাবারগাছ অন্যান্য সাধারণ গাছের চাইতে তিনগুণ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। এটি একটি যৌক্তিক ভিত্তি, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক কার্বন ট্রেডিং অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ফান্ড থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। পামওয়েল উত্পাদনকারী দেশগুলোর মাধ্যমে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরে যে বিরূপ প্রভাবের প্রতিফলন ঘটছে বাংলাদেশের রাবার উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ঐ সমস্ত বিরূপ প্রভাবের অবসান ঘটিয়ে ক্ষতিকারক কার্বনের পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। রাবারগাছ অনুর্বর পতিত জমিতে জন্মায়। এছাড়া পাহাড়ি জমিতে রাবার চাষ ভালো হয়। আমাদের দেশে বন বিভাগের আওতায় অনেক পাহাড় আছে, যেখানে বনায়ন করা হয়নি। ঐ সমস্ত পাহাড়ে রাবার চাষ করা হলে একদিকে পরিবেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে যে সমস্ত ঝুঁকি রয়েছে যেমন :খরা, অতিবৃষ্টি, ভূমি রক্ষা, বন্যা—এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করা সহজ হবে। দ্রুত বনায়নের জন্য দ্রুত বর্ধনশীল হিসেবে এ প্রজাতির জুড়ি নেই। এটি বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে সাহায্য করে, কার্বন শোষণের মাধ্যমে সবুজায়ন করে। রাবার চাষের উন্নয়ন হলে রাবারবাগানে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাহাড়ি, বাঙালি নারীরা কাজে নিয়োজিত হতে পারবে, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন হবে এবং নারীর ক্ষমতায়নের পথ সুগম হবে। দেশীয় কাঁচা রাবার যখন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা হবে, হাজার হাজার শিল্পপণ্য উত্পাদনে অনেকের কর্মসংস্থান হবে। রাবারভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক কর্মসংস্থান সম্ভব। শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নয়, বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি ২৫ একর রাবারবাগানে ১০ জন লোকের কর্মসংস্থান হয়।
প্রকৃতপক্ষে রাবার চাষ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত। এই খাতের মাধ্যমে পরিবেশের জন্য এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যাপক অবদান রাখা সম্ভব। শত শত একর খালি পাহাড়ি জমি ও অনান্য পতিত জমি রাবার চাষের আওতাভুক্ত করে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে সবুজায়নের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় অবদান রাখা যাবে। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা। বিদ্যমান সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে রাবার উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা এবং রাবারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন শুধু সময়ের ব্যাপার।
আমাদের দেশের যেসব স্থানে এখানো পর্যন্ত রাবার চাষ করা হয়নি, সেসব স্থানে রাবারবাগান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। রাবার প্রসেসিং করার জন্য পৃথক পৃথক উন্নত প্রসেসিং প্ল্যান্ট সরকারি উদ্যোগে স্থাপন করতে হবে। এতে করে রাবারের উত্পাদন বৃদ্ধি পাবে এবং মানসম্মত রাবার পাওয়া যাবে। রাবারগাছকে প্রক্রিয়াজাত করে মূল্যবান আসবাবপত্র তৈরির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হবে। রাবারশিল্পের সঙ্গে রাবারগাছের কাঠও দেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে আসতে পারে। এতে করে এই সেক্টরে আগামী ১০ বছরে প্রায় ৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। বাংলাদেশে দারুণ সম্ভাবনাময় পরিবেশবান্ধব রাবার চাষের উন্নয়নে সরকারি সংশ্লিষ্ট মহলের সুদৃষ্টি প্রদান এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
n লেখক :শিক্ষার্থী,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
