কিশোর অপরাধের প্রাবল্য

আপডেট : ২৯ মে ২০২১, ২২:১৭

সাধারণত কিশোর বয়সিদের দ্বারা সংঘটিত বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে কিশোর অপরাধ বলে। কিশোরেরা যখন সামাজিক মূল্যবোধ ও নিয়মবিরোধী কাজ করে, তখন তা কিশোর অপরাধের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কিশোর বা অপ্রাপ্তবয়স্ক একটি ছেলে বা মেয়ে অনেকটাই আবেগী হয় এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, অদম্য আশা আর জীবজগত্ সম্পর্কে জানতে চাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এ সময় তারা নিজের সিদ্ধান্তগুলোকেই সঠিক বলে মনে করে থাকে, যার ফলে কোনো কারণে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না হলে আশাভঙ্গের বেদনায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে তারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে ১৮ বছরের নিচে কেউ অপরাধ করলে তা কিশোর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিশোর অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার চেয়ে সংশোধনকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়, যার কারণে কিশোর অপরাধীদের সংশোধনের জন্য টঙ্গীতে কিশোর সংশোধন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। বর্তমানে আমাদের দেশে কিশোর অপরাধের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের অসংগতি, হতাশা, দারিদ্র্য কিশোর অপরাধ সৃষ্টির উল্লেখযোগ্য কারণ। আর ধনী পরিবারের সন্তানদের নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা, মাত্রাতিরিক্ত বিলাসিতা এবং আবেগের বশবর্তী হওয়া, পিতামাতা কর্তৃক সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারা, ভগ্ন পরিবার ও পিতামাতার দাম্পত্য কলহ, পারিবারিক অস্থিতিশীলতা ও অসম্প্রীতি, পিতা বা মাতার পুনর্বিবাহ, অতিরিক্ত শাসন, রক্ষণশীলতা প্রভৃতি কারণে কিশোরেরা অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ে। এছাড়া কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে যেসব সামাজিক প্রভাব রয়েছে তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : খারাপ বন্ধুর সঙ্গে মেলামেশা, মাদকের সহজলভ্যতা, সমাজে উঠতি বয়সিদের বিভিন্ন ধরনের গ্রুপিং, শিশুশ্রমে বাধ্য করা, কিশোরদের রাজনীতিতে বাজেভাবে ব্যবহার করা, অপসংস্কৃতি, সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব ইত্যাদি।

কিশোর অপরাধ একটি দেশ ও জাতির জন্য অশনিসংকেত। কিশোরদের যে সময়ে বইখাতা, স্কুলব্যাগ, খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ আর দুরন্তপনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা এবং তাদের সজীব, নিষ্কলঙ্ক জীবনগুলোকে স্বাভাবিক জীবনযাপনের মাধ্যমে অতিবাহিত করা প্রয়োজন; সেই সময়ে কিশোর অপরাধের মতো ভিন্ন কর্মকাণ্ড তাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনাগুলোকে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দেয়। কিশোরদের কর্তৃক অপহরণ, ধর্ষণ, রাস্তাঘাটে প্রকাশ্য ছিনতাই, চাঁদাবাজি, পকেটমার, অ্যাসিড নিক্ষেপ ইত্যাদি কারণে সমাজে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে শান্তি-শৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি হয়। বর্তমানে কিশোরীদেরও মাদক গ্রহণ থেকে শুরু করে নানা ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে; যা পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে। কিশোর অপরাধের কারণে সমাজে মাদকাসক্তি ও যৌনাচার বেড়ে চলেছে; যার ফলে সমাজের নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটছে।

একজন কিশোর কর্তৃক সৃষ্ট অপরাধের জন্য শুধু সে-ই দায়ী নয়; এর জন্য দায়ী আমাদের পরিবর্তনশীল সমাজব্যবস্থা; পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান। কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে আসার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ অতীব জরুরি। শিশু-কিশোরদের প্রতি বিশেষ যত্নবান হতে হবে, তাদের আবেগকে বুঝতে হবে এবং ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক বোঝাতে হবে, সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে পিতামাতার বিশেষ নজর রাখতে হবে, শিশু-কিশোরদের সুষ্ঠু সামাজিকীকরণের জন্য গঠনমূলক পারিবারিক, সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে কিশোর অপরাধ সংশোধনকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমগুলোকে শিশুর মানসিক বিকাশের উপযোগী কার্যক্রম ও অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে। আমাদের বর্তমান কিশোরদের প্রকৃত মানুষ ও নিরপরাধ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলেই জাতির প্রকৃত উন্নতি সম্ভব।

n লেখক :শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।