বন্ধু নির্বাচনে সচেতনতা দরকার

আপডেট : ৩০ মে ২০২১, ২১:১৩

 ‘সত্ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসত্ সঙ্গে সর্বনাশ’—এই প্রবাদটির সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। বন্ধুরা যেমন আমাদের আলোর পথ দেখাতে পারে, ঠিক তেমনি বন্ধুরাই টেনে নিয়ে যেতে পারে অন্ধকার কোনো জগতে। পরিবারের পর আমাদের ভরসার জায়গা হলো বন্ধুরা। সুখে-দুঃখে তারাই আমাদের আপনজনের ভূমিকা পালন করে। আমাদের জীবনে নানা ক্ষেত্রে বন্ধুদের দ্বারাই আমরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়ে থাকি। শৈশব, কৈশোরের বন্ধুত্বগুলো অনেকটা খেলার ছলে তৈরি হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে শৈশব কৈশোরের গণ্ডি পেরিয়ে আমরা যখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখি, তখন বন্ধু নির্বাচন করতে হয় সচেতনভাবে।

স্কুল-কলেজের ইউনিফরমের নিয়মে বাঁধা সংকীর্ণ  জীবন ছেড়ে এক জন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখে। নতুন পরিবেশে অনেকটা অবাধ স্বাধীনতার নতুন জীবন। এই নতুন জীবনে নতুন নতুন সব অচেনা মুখ। স্কুলে কিংবা কলেজে থাকাকালীন আমাদের বন্ধু নির্বাচনের পরিধি থাকে খুব সংকীর্ণ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধু নির্বাচনের পরিধি বিশাল। নিজ বিভাগীয় শ্রেণিকক্ষে, সংযুক্ত আবাসিক হলে থাকাকালীন, নানান স্বেচ্ছাাসেবী সংগঠনে যোগদানকালীন, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সময় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে নানান উপায়ে নানান সময় বিভিন্ন বিভাগ এবং অনুষদভুক্ত সহপাঠীদের সঙ্গে  যোগাযোগ তৈরি হয়। আর যোগাযোগ থেকে হয় বন্ধুত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধু নির্বাচন আপনার সার্বিক ব্যক্তিত্ব গঠন ও বাকি শিক্ষা জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ভুল মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব আপনার মানসিক স্বাস্থ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই বিপুলসংখ্যক সহপাঠীর মধ্য থেকে বন্ধু বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখা উচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা মাত্র কোনো বাছবিচার ছাড়াই কয়েক দিনের পরিচয়ে কয়েক ডজন বন্ধু বানিয়ে ফেলার চিন্তা শুরুতেই বাদ দিতে হবে। কিছুদিন সময় নিয়ে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করুন। তাদের বোঝার চেষ্টা করুন এবং আপনাকে বোঝার সুযোগ করে দিন। এদের মধ্যে যাদের সঙ্গে আপনি ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা, নীতি-আদর্শ এবং মতের মিল খুঁজে পান, তাদের বেশি গুরুত্ব দিন। ধীরে ধীরে যোগাযোগ বাড়ান। এক্ষেত্রে অন্য সহপাঠীদের ভিন্ন ইতিবাচক মতাদর্শকে সম্মান করা এবং তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও জরুরি। নিজের বিষয়ে তাদের জানান। তবে একেবারেই অচেনা পরিবেশে অজানা মানুষের কাছে আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ এক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ ভবিষ্যতে আপনার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। আগে বন্ধুর বিশ্বস্ততা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন। আপনার মতো যাদের জীবনের লক্ষ্য একই রকম, তাদের মধ্য থেকে বন্ধু বাছাই করুন। এতে উভয়ের উন্নতির পথ সহজতর হবে। আপনি সহশিক্ষা কার্যক্রমে আগ্রহী হলে খেলাধুলা কিংবা সাংস্কৃতিক কোনো সাংস্কৃতিক  কর্মকাণ্ডে পারদর্শী এমন কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব  করুন। এতে আপনার দক্ষতা শানিত হওয়ার পাশাপাশি  সুসম্পর্ক  গড়ে উঠবে। তবে কখনোই এক বন্ধুর ওপর সবকিছুতে নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন না। কেউ আপনার ঘুরতে যাওয়ার সঙ্গী হবে, কেউ পড়াশোনায়, কেউ আবার সহশিক্ষা কার্যক্রমে। সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ বন্ধুত্ব গড়ার চেষ্টা করুন। কেউ কেউ উচ্ছৃঙ্খল কিছু আধুনিক শ্রেণির বন্ধুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে নিজের স্বকীয়তা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেন। অনেকটা কাকের ময়ূর সাজার গল্পের মতো। নিজেকে উন্নত করুন তবে নিজের স্বকীয়তা, নিজের ইতিবাচক ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে নয়। যাদের সঙ্গে আপনাকে নকল ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলতে হয়, তাদের এড়িয়ে চলুন। বিশেষ করে আধুনিকতার দোহাই দিয়ে যে কোনো প্রকার মাদকসেবন, সরবরাহ এবং বিক্রির  মতো গর্হিত কাজে জড়িত এরকম সহপাঠীদের থেকে দূরে থাকুন, সম্ভব হলে তাদের ধরিয়ে দিন। ইচ্ছাকৃত কুত্সা রটায়, অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়, নেতিবাচকতা ছড়াতে চায় এবং স্বজ্ঞানে উগ্রতা সমর্থনকারী, বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব না করাটাই আপনার জন্য কল্যাণকর হবে। এমন বন্ধু নির্বাচন করুন যে ইতিবাচকতা ছড়ায়, কারো পিছে কুত্সা রটনার বদলে আড়ালে ডেকে ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়, অন্যের সম্মান রক্ষা করে এবং খারাপ সময়ে সঙ্গে থাকার ব্যাপারে সদা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

n লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়