যে কারণে বৃদ্ধদের জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত হাসপাতাল

আপডেট : ৩০ মে ২০২১, ২১:১৩

শিশুদের মতোই বৃদ্ধদের জন্য পৃথক বিশেষায়িত হাসপাতাল চালুর ভাবনা অনেকের মধ্যেই আনাগোনা করছে। তবে এবারের কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের আক্রমণ দেখে সেই ভাবনা বাস্তবায়নের বিষয়টি গভীর বিবেচনার দাবি নিয়ে সামনে এসেছে। করোনা ভাইরাসের আক্রমণের শিকার প্রধানত বৃদ্ধ মানুষেরা। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ তারাই। মারাও যাচ্ছেন বৃদ্ধরাই বেশি। শুধু করোনা ভাইরাসের নয়, অনেক রোগব্যাধিরই প্রিয় জায়গা বৃদ্ধদের নাজুক দেহ। কিছু কিছু রোগ শুধু বৃদ্ধদেরই হয়। প্রস্টেট গ্লান্ডের স্ফীতি, কিডনি সমস্যা, চোখের ছানি, গ্লুকোমা, ইউটেরাস ইনফেকশন, পাইলস প্রভৃতি। ডায়াবেটিস, হূদরোগ সব বয়সেরই হলেও বৃদ্ধদের ঝুঁকি বেশি এবং বেশির ভাগ বৃদ্ধরাই এসব রোগে আক্রান্ত।

সাধারণ হাসপাতালেও এসব রোগের চিকিত্সা হয়। দেশে বিশেষায়িত হাসপাতালও আছে চোখ, কিডনি, ডায়াবেটিস, হূদরোগ প্রভৃতির জন্য। বৃদ্ধদের দুর্ভাগ্য, প্রায় সবকটি রোগ একসঙ্গেই বাসা বাঁধে দেহে। আর চিকিত্সার জন্য ছুটতে হয় এ হাসপাতাল হতে সে হাসপাতালে। আবার এবারের করোনা হানার পরে যুবা বয়সিদেরই ঠাঁই নেই হাসপাতালে, সেখানে বৃদ্ধরা তো একেবারেই ব্রাত্য। বিনা চিকিত্সায় বৃদ্ধদের মৃত্যুর খবর এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার। এর সমাধান করতে হবে আমাদের। ৬৫ ঊর্ধ্বে মানুষের শতকরা হার ২০১০ সালেও যেখানে ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০১৫ সালে এসে তা হয়েছে ৬ শতাংশ। অথচ তার আগে ১৯৭০-এর ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২০১০ সালে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে অর্থাত্ ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়তে সময় লেগেছে ৪০ বছর। আর পরের পাঁচ বছরেই বেড়েছে সেই ১ দশমিক ২ শতাংশ। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ২০২১ সালের শতকরা হার আরো বাড়বে বৈকি।

বর্তমান সরকারের গতিশীল নেতৃত্বে স্বাস্থ্যসেবার বিস্তৃৃতি এ সাফল্য এনে দিয়েছে। এ সাফল্যকে ধরে রাখতে হলে চাই বৃদ্ধদের সুস্বাস্থ্যের প্রতি অধিকতর দৃষ্টি আর মনোযোগ। সক্ষম সুস্থ বৃদ্ধ তা বয়স যতই হোক না কেন—পরিবার ও রাষ্ট্রের সম্পদ। উলটো দিকে অসুস্থ, অক্ষম বৃদ্ধকে পরিবারও বোঝা মনে করে। রাষ্ট্রকে তার দেওয়ারও থাকে না কিছুই। তার চিকিত্সার দায়িত্ব নিতে হয় রাষ্ট্রকেই। কারণ, সংবিধানের মৌলিক অধিকারসমূহের মধ্যে চিকিত্সা অন্যতম। তাই, ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধদের চিকিত্সার জন্য চাই পৃথক বিশেষায়িত হাসপাতাল—যা কেবল নির্দিষ্ট থাকবে বৃদ্ধদের জন্যই।

বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতির অনুকূলে ২০১৩ সালে সরকার উত্তরায় একটি এক বিঘার প্লট বরাদ্দ করেছে বৃদ্ধদের স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা-সংক্রান্ত (Geriatric) হাসপাতাল নির্মাণের জন্য। দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও কোনো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। আর সমিতির একার পক্ষে অমন একটা বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণও দুঃসাধ্য। সরকার যদি এগিয়ে আসে, তবে সরকার ও সমিতির সমঝোতায় একটি মানসম্মত বিশেষায়িত হাসপাতাল সেখানেই নির্মাণ করা যেতে পারে। জমির মালিক হিসাবে সমিতির সদস্যরা অগ্রাধিকার এবং বিশেষ সুবিধা পেলেও হাসপাতালটি হবে দেশের সব বৃদ্ধের জন্য। বৃদ্ধরা জানবেন তাদের নিজস্ব একটা হাসপাতাল আছে, যেখানে গেলে তাকে ফিরে আসতে হবে না হাসপাতালের দুয়ার থেকে।

এ মুহূর্তে দেশের বৃদ্ধরা সবাই মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মের। তারা যত দিন বেঁচে থাকবেন তত দিন বেঁচে থাকবে দেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস। বৈশ্বিক মহামারি করোনার শিক্ষা থেকে সরকার এগিয়ে আসবেন এই মহতি উদ্যোগ বাস্তবায়নে, এটাই প্রবীণ নাগরিকদের প্রত্যাশা। বৃদ্ধদের আশীর্বাদে ধন্য হোক আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র।

n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব