রবিবার ভোরে আবারও ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে সিলেট নগরী। সিলেট আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানান, রবিবার ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ২ দশমিক ৮। এর উত্পত্তিস্থল ছিল সিলেটের সীমান্তবর্তী জৈন্তা এলাকা। এর আগে শনিবার একই উত্পত্তিস্থল থেকে একাধিকবার বিভিন্ন মাত্রায় ভূমিকম্প হয়। সরকারি হিসাবেই সাড়ে তিন ঘণ্টার ব্যবধানে চার বার ভূমিকম্প হয়। সেদিন সর্বোচ্চ চার মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
বিষয়টি নিয়ে একদিকে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে ভূমিকম্প নিয়ে সিলেট বিভাগ জুড়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, বারবার শুধু সিলেটেই কেন ভূমিকম্প। এর উত্পত্তিস্থল যদি সিলেটের জৈন্তায় হয়, তবে জৈন্তা-তামাবিলবাসী কেন ভূমিকম্প অনুভব করেননি। এ প্রসঙ্গে তারা বলেন, সিলেটে কর্মরত আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি ‘সেভরন’ কোনো বিস্ফোরণের মাধ্যমে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কি না—সে ব্যাপারে অনুসন্ধান প্রয়োজন। তারা বলছেন—আসলেই কী প্রাকৃতিক ভূমিকম্প ছিল, নাকি ছিল কৃত্রিম কম্পন? এই কম্পন প্রাকৃতিক ভূকম্পন নয়—মন্তব্য করে অনেকেই লিখছেন ‘শেভরন’ তাদের জরিপ কাজের জন্য ভূগর্ভে মাইন বিস্ফোরণ ঘটানোর ফলে বারবার এরকম কম্পনের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে রবিবার শেভরনের কমিউনিকেশন কর্মকর্তা শেখ জাহিদুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ভূকম্পনের সঙ্গে শেভরনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সিলেটে শেভরনের কোনো জরিপ কাজ চলমান নেই। শেভরন কোনো মাইন বিস্ফোরণও ঘটায়নি।
ছোট ছোট ভূমিকম্প, বড় বার্তা
এদিকে শনিবার থেকে দফায় দফায় ভূমিকম্পের পর বিশেষজ্ঞরা জনসাধারণকে সতর্ক ও সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, ভূমিকম্প নিয়ে অপপ্রচার জনসচেতনতা সৃষ্টিতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন, ছোট ছোট ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের বার্তা বহন করে। তাই আগামী তিন-চার দিন সিলেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই কয়েক দিন সবাইকে সতর্ক থাকা উচিত।
নগরে ২৫টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ
ভূমিকম্পের ডেঞ্জারজোন হিসেবে পরিচিত সিলেটে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবনগুলো। শনিবার কয়েক দফা ভূমিকম্পের পর নগরীর পনিটুলা এলাকায় দুইটি ছয় তলা ভবন হেলে পড়ার সংবাদে রাতের মধ্যেই লোকজন সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আগামী ১০ দিন বন্ধ রাখার নির্দেশ
ঘন ঘন ভূমিকম্প হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নগরীর সব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আগামী ১০ দিন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক। একই সময়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বাসিন্দাদের অন্যত্র সরে যেতে বলেন তিনি। রবিবার বিকালে নগরীর কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট পরিদর্শন শেষে মেয়র এ নির্দেশনা দেন।
বিশেষজ্ঞরা সিলেটে আগামী এক সপ্তাহ বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা করছেন। মেয়র জানান, সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারের মিতালী ম্যানশন, রাজা ম্যানশন ও বন্দরবাজারের সিটি সুপার এবং মধুবন সুপার মার্কেট আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হিসেবে চিহ্নিত। তাই সংশ্লিষ্টদের আগামী ১০ দিন মার্কেট বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হবে। মেয়রের নির্দেশনার পর এই বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে বৈঠকে বসেছেন মার্কেটগুলোর কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীরা।
জরুরি কন্ট্রোল রুম খুলেছে সিটি করপোরেশন
ঘন ঘন ভূমিকম্প হওয়ার কারণে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর ও শাখার সঙ্গে জরুরি সভা করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে এক দিনে অল্প সময়ে অন্তত চার বার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। সে অনুযায়ী সিলেট সিটি করপোরেশন দুর্যোগ মোকাবিলায় নিজস্ব একটি কন্ট্রোল রুম খুলেছে। দুর্যোগ পরিস্থিতিতে সিলেট মহানগরে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে সব বিভাগ, শাখা ও দপ্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। খোলা হয়েছে একটি হটলাইন। যার নম্বর ০১৯১১২৪৯৬৯৯। সিলেট সিটি করপোরেশনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত জরুরি সভা থেকে নগরবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে ও দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নোটিশ দেওয়ার পরও ভবনগুলো ভাঙা হচ্ছে না
বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে পড়ে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বারবার নোটিশ দেওয়ার পরও মালিকরা ভবনগুলো ভাঙছেন না। নানা অজুহাতে তারা ভবনগুলো ভাঙা থেকে বিরত রয়েছেন। সিটি করপোরেশন ইতিমধ্যে নগরীতে এরকম ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করেছে। যার মধ্যে সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন ভবনও রয়েছে। সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানান, ২০১৯ সালে চিহ্নিত ভবনগুলো হচ্ছে—জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উত্তর পাশের কালেক্টরেট ভবন-৩, জেলরোডের সমবায় ব্যাংক ভবন, একই এলাকায় মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার সাবেক কার্যালয় ভবন, সুরমা মার্কেট, বন্দরবাজারের সিটি সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজারের মিতালী ম্যানশন, দরগা গেইটের হোটেল আজমীর, বন্দরবাজারের মধুবন সুপার মার্কেট, টিলাগড় কালাশীলের মান্নান ভিউ, শেখঘাট শুভেচ্ছা-২২৬ নম্বর ভবন, যতরপুরের নবপুষ্প ২৬/এ বাসা, চৌকিদেখির ৫১/৩ সরকার ভবন, জিন্দাবাজারের রাজাম্যানশন, পুরানলেনের ৪/এ কিবরিয়া লজ, খারপাড়ার মিতালী-৭৪, মির্জাজাঙ্গাল মেঘনা এ-৩৯/২, পাঠানটুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বাগবাড়ির একতা ৩৭৭/৭ ওয়ারিছ মঞ্জিল, একই এলাকার একতা ৩৭৭/৮ হোসেইন মঞ্জিল, একতা-৩৭৭/৯ শাহনাজ রিয়াজ ভিলা, বনকলাপাড়া নূরানী-১৪, ধোপাদীঘির দক্ষিণ পাড়ের পৌরবিপণি মার্কেট ও ধোপাদীঘির পাড়ের পৌর শপিং সেন্টার।
